ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজাকে ঘিরে তেহরান এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধি অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন আলী খামেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রথমে মার্চে দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ সংঘাতের কারণে তা পিছিয়ে যায়। অবশেষে প্রায় চার মাস পর শুরু হচ্ছে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান, যা শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনাতেও পরিণত হয়েছে।
সাত দিনের রাষ্ট্রীয় আয়োজন
শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে শোকানুষ্ঠানের সূচনা হবে। এদিনই অধিকাংশ বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
শনিবার ও রোববার তেহরানের বিশাল নামাজ কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মরদেহও একই স্থানে থাকবে।
এরপর সোমবার ও মঙ্গলবার জানাজার শোভাযাত্রা ইরানের কোম শহরের দিকে যাবে। বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি অভ্যর্থনার আয়োজন করা হবে। পরে নাজাফ ও কারবালায়ও জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
সবশেষে আগামী শুক্রবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে খামেনিকে দাফন করা হবে। মাশহাদই ছিল তার জন্মস্থান।
যেসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান থাকছেন
এবারের রাষ্ট্রীয় জানাজায় কয়েকটি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তেহরানে উপস্থিত থাকবেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। তাই ইসলামাবাদের উপস্থিতিকে কূটনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমানও রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দিচ্ছেন।
আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
এ ছাড়া জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলিও তেহরানে উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে যেসব দেশ
সব দেশ রাষ্ট্রপ্রধান পাঠাচ্ছে না। তবে অনেক দেশই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও শীর্ষ সরকারি প্রতিনিধিদের পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ।
ভারতের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা এবং বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন। ভারতের বিরোধী নেতাদের মধ্যেও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ ও মেহবুবা মুফতি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে থাকছেন।
চীনের পক্ষ থেকে অংশ নেবেন দেশটির জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েই।
রাশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে যাচ্ছেন দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ।
আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ইতোমধ্যেই তেহরানে পৌঁছেছেন। এছাড়া দেশটির অর্থনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদারও অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে আফগান গণমাধ্যম জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দেবেন বলে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজা
ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জানাজাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় যে প্রায় এক কোটি মানুষের উপস্থিতি হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এত বড় জনসমাগম এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কারণে তেহরানসহ পুরো ইরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এই রাষ্ট্রীয় জানাজায় উপস্থিত থাকছেন না।
ভারতে নিযুক্ত তার প্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনীও কঠোর বার্তা দিয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দপ্তরের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছেন, জানাজা চলাকালে কিংবা এর আগে-পরে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই রাষ্ট্রীয় জানাজা শুধু একজন নেতার শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক জোট এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণ বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধি একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ায় ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, চলমান শান্তি প্রচেষ্টা এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও নানা পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে খামেনির শেষ বিদায়ের এই আয়োজন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

