ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। রোববার (৫ জুলাই) ভোর থেকেই গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শোকার্ত মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে।
ইরানি সংবাদসংস্থা মেহের জানিয়েছে, রাজধানীর প্রধান নামাজের স্থান ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সকাল থেকেই শোকানুষ্ঠান শুরু হয়। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা মানুষের ধারাবাহিক উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থল এবং আশপাশের এলাকা সারাদিনই জনাকীর্ণ ছিল। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের এই স্রোত দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে।
শোকানুষ্ঠান নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি জরুরি সেবা, চিকিৎসক দল ও স্বেচ্ছাসেবীরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা, খাবার, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং যাতায়াত নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
খামেনি প্রায় ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি নিহত হন। এরপর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তার দাফন পিছিয়ে দেওয়া হলেও বর্তমানে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও শেষ বিদায়ের কর্মসূচি চলছে।
শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বহু মানুষের হাতে ছিল লাল পতাকা, যা শিয়া সংস্কৃতিতে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। গ্র্যান্ড মোসাল্লাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই পতাকা ও খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাতের বিশাল প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানজুড়ে ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’ স্লোগানও ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে জড়ো হওয়া মানুষের একটি অংশ ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের ধ্বংস হোক’—এমন স্লোগান দিচ্ছেন। এসব দৃশ্য ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক আবহ এবং খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে জনমনের প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থল এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারী অস্ত্রধারী নিরাপত্তা সদস্য ও স্নাইপারও দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে পুরো কর্মসূচি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।
খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক জনসমাগম দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়; বরং ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনারও প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বারবার প্রতিশোধের অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ সরকারকে শক্তিশালী জনসমর্থনের বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই শোকানুষ্ঠান আগামী দিনগুলোতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

