লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত দিন যত যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ অব্যাহত থাকলেও প্রতিদিনই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৯৫৪ জন, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার (৪ জুলাই) প্রকাশিত হালনাগাদ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় আরও ৩০০ জনের বেশি বেড়েছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করায় এই সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগের পর জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত প্রথম ৭২ ঘণ্টা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ফলে ধসে পড়া ভবন ও বাড়িঘরের নিচে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন উদ্ধার বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ধীরে ধীরে তাদের মাঠপর্যায়ের অভিযান সমাপ্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে হাজারো পরিবার এখনো নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকাগুলোতে অপেক্ষা করছেন। অনেকেই আশা ছাড়তে না চাইলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা হয় গত ২৪ জুন, যখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী কম্পন আঘাত হানায় বহু ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়ে এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল। বহু আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সেখানে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও জরুরি সেবাব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
মূল দুটি ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে একের পর এক পরাঘাত। দেশটির আবহাওয়া ও ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট ৯৪২টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এসব পরাঘাত ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রাণহানিই নয়, এই দুর্যোগ ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং মানবিক পরিস্থিতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও পুনর্বাসন, গৃহহীন মানুষের আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং বিধ্বস্ত জনপদ পুনর্গঠনে দেশটিকে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

