ইরান এখন শোকের আবহে ডুবে আছে। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘিরে রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে ইরানের বিভিন্ন শহর এবং ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় নগরীগুলোতে চলছে বিশাল আয়োজন। ছয় দিনব্যাপী এই কর্মসূচিকে শুধু একটি জানাজা বা দাফন অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে শোক, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শন, রাজনৈতিক বার্তা এবং নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে অনিশ্চয়তার এক জটিল দৃশ্যপট।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে কাঁচঘেরা বিশেষ স্থাপনায় রাখা হয়েছে আলি খামেনির কফিন। কালো পোশাকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। কেউ কাঁদছেন, কেউ বুকে আঘাত করছেন, কেউ হাতে ধরে আছেন প্রয়াত নেতার ছবি। ইরানি কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরজুড়ে এই শোকানুষ্ঠানে মোট এক থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির কফিন প্রদর্শন করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কয়েক দিনব্যাপী শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।
কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের মাঝেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে গেছে একজন মানুষকে ঘিরে—মোজতবা খামেনি কোথায়?
তিনি শুধু প্রয়াত আলি খামেনির ছেলে নন। তিনি এখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা। বাবার মৃত্যুর পর ইরানের ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসেছেন ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি। অথচ বাবার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্তেও তাকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি নেই শোকমঞ্চে। নেই কফিনের পাশে। নেই প্রার্থনা অনুষ্ঠানে। এমনকি জনগণের উদ্দেশে সরাসরি কোনো ভাষণও দেননি।
এই অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তুলছে। একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতা, যিনি এমন সংকটময় সময়ে দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি কেন জনসমক্ষে আসছেন না? এটি কি কেবল নিরাপত্তাজনিত সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক হিসাব আছে?
ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতির প্রধান কারণ নিরাপত্তা। তেহরানের দাবি, ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এই ঝুঁকির কারণেই তাকে জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না। বিশেষ করে এমন একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, যেখানে দেশ-বিদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং বিপুল জনতা উপস্থিত থাকবেন, সেটি নিরাপত্তার দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাই এই নিরাপত্তা আশঙ্কার মূল পটভূমি। ওই হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রী, বোন, বোন-জামাই এবং ১৪ মাস বয়সী এক ভাগ্নি। একই ঘটনায় মোজতবা খামেনি প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। Reuters জানিয়েছে, মোজতবা খামেনি তার বাবার উত্তরসূরি হওয়ার পরও এখনো জনসমক্ষে দেখা দেননি এবং একই হামলায় তিনি আহত হয়েছেন বলে বলা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মোজতবার আড়ালে থাকা একদিকে নিরাপত্তার কৌশল, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর বাস্তবতা। কারণ ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি ধর্মীয়, সামরিক, কূটনৈতিক এবং আদর্শিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। এমন একজন নেতা যদি দীর্ঘ সময় জনগণের সামনে না আসেন, তাহলে তার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আলি খামেনির মৃত্যুর কয়েক দিন পর ৮ মার্চ মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করে এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত তার প্রতি সমর্থন জানায়। কিন্তু সেই ঘোষণা থেকে এখন পর্যন্ত তার উপস্থিতি মূলত বিবৃতি, পোস্টার ও রাষ্ট্রীয় প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জনগণ তাকে সরাসরি দেখেনি। তার কণ্ঠও সরাসরি শোনা যায়নি।
১৮ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে মোজতবা খামেনির নামে জানানো হয়, তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে স্মারক চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতা বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন। কর্মকর্তারা তাকে আশ্বস্ত করেন যে এই চুক্তি ইরান ও তার সহযোগীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
এরপর ২৮ জুন আরেক লিখিত বার্তায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নেন। সেখানে তার বাবার হত্যাসহ ইরানের বিরুদ্ধে হামলাগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতাদের দায়ী করা হয়। তিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাদের বিচারের দাবি জানান এবং কঠোর জবাবদিহির আহ্বান জানান।
তবে এখানেই প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়। যদি মোজতবা খামেনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে পারেন, যদি তার নামে বিবৃতি প্রকাশ করা যায়, যদি তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—তাহলে তিনি নিজে কেন সামনে আসছেন না?
এর একটি উত্তর হতে পারে নিরাপত্তা। ইসরায়েল বহু বছর ধরে প্রতিপক্ষের সামরিক, রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কৌশল ব্যবহার করে আসছে। হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি কিংবা ইরানি সামরিক কাঠামো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতৃত্বকে অচল করা ইসরায়েলি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। তাই মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে আনা মানে তাকে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে ফেলা—এমন আশঙ্কা ইরানি নিরাপত্তা মহলে থাকতে পারে।
কিন্তু আরেকটি ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। মোজতবার অনুপস্থিতি ইরানি নেতৃত্বের ভেতরকার দুর্বলতাকেও সামনে আনতে পারে। একজন নতুন নেতা যদি দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের সামনে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতার বার্তা দুর্বল হয়ে যায়। ইরান এখন শুধু শোক পালন করছে না; একই সঙ্গে একটি বড় ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আলি খামেনি প্রায় চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রতীক ছিলেন। তার মৃত্যু একটি যুগের অবসান। সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্য নতুন নেতার দৃশ্যমানতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই মোজতবার অনুপস্থিতি শুধু পারিবারিক শোকের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ক্ষমতার ধারাবাহিকতা, জনমত নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বার্তার সঙ্গে জড়িত। তার ছবি শোকযাত্রায় দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মানুষ তাকে দেখছে না। তার নামে বিবৃতি প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজে কথা বলছেন না। তার পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করা হচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজে রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে সরকার দেখাতে চাইছে, আলি খামেনির মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রযন্ত্র অটুট আছে। বিশাল শোকযাত্রা, বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং শহরজুড়ে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মাধ্যমে সেই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি সেই বার্তার ভেতরেই একটি ফাঁক তৈরি করছে।
মোজতবা খামেনি যদি নিরাপত্তার কারণে আড়ালে থাকেন, তাহলে সেটি বোঝা যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আড়ালে থাকলে তা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দেবে। তার শারীরিক অবস্থা কেমন? তিনি কতটা সক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? ইরানের ক্ষমতার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ তার হাতে, নাকি সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
আলি খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তাই শুধু একজন প্রয়াত নেতার শেষবিদায় নয়। এটি ইরানের নতুন যুগের প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। শোকের মঞ্চে অনুপস্থিত থেকেও মোজতবা খামেনিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার নীরবতা, তার অদৃশ্য থাকা এবং তাকে ঘিরে নিরাপত্তার দেয়াল—সব মিলিয়ে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই মুহূর্তে সম্ভবত ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত তথ্য হলো মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান। তিনি কোথায় আছেন, কতটা সুস্থ আছেন, কবে জনসমক্ষে আসবেন—এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ইরানের রাজনীতিতে এখন উপস্থিতির চেয়েও অনুপস্থিতি বেশি কথা বলছে।

