বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন পুরোনো ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থকে আরও সরাসরি সামনে আনছে, অন্যদিকে চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে কৌশলগত প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিতে মাঝারি শক্তির দেশগুলো বুঝতে পারছে, একা চলার যুগ তাদের জন্য নিরাপদ নয়। বড় শক্তিগুলো হয়তো আপাতত এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সামনে প্রশ্ন হলো—তারা কি আলোচনার টেবিলে বসবে, নাকি অন্যদের সিদ্ধান্তের শিকার হবে?
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বব্যবস্থায় একটি বড় ভাঙনের কথা বলেন। তিনি সতর্ক করেন, বড় শক্তিগুলো একা পথ চলার ঝুঁকি নিতে পারলেও মাঝারি শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ তারা যদি নিজেরা সম্মিলিত অবস্থান তৈরি না করে, তাহলে বৈশ্বিক ক্ষমতার খেলায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ৬ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত ড্যানিয়েল গ্রোসের বিশ্লেষণে এই বাস্তবতার মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাধারণ কোনো মাঝারি শক্তি নয়। তার অর্থনীতি বিশাল, বাজার শক্তিশালী, নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা ব্যাপক এবং বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাব এখনো বড়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতির তুলনায় ইউরোপের অর্থনীতি কিছুটা ছোট হলেও জাপান, যুক্তরাজ্য ও ভারতের অর্থনীতির তুলনায় তা কয়েক গুণ বড়। ফলে ইউরোপ নিজেকে কেবল মাঝারি শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না—এটি স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
তবে এখানেই একটি কৌশলগত ভুলের সম্ভাবনা আছে। ইউরোপ যদি নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো একক বড় শক্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তাহলে বাস্তবতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে। কারণ বৈশ্বিক মঞ্চে শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো পূর্ণ সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা ইউরোপের নেই। আবার এটিও সত্য যে ইউরোপ এত ছোট নয় যে তাকে অন্যদের পাশে দাঁড়ানো সাধারণ অংশীদার হিসেবে ভাবতে হবে। তাই ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো—সমমনা মাঝারি শক্তিগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া, তবে প্রভুত্বের ভঙ্গিতে নয়; বরং সমানদের মধ্যে প্রথম হিসেবে।
এই নেতৃত্বের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো আধিপত্যবাদী নেতৃত্ব নয়, চীনের মতো চাপসৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক প্রভাবও নয়—বরং এমন একটি নেতৃত্ব, যেখানে আলোচনা, আস্থা, নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আজকের বিশ্বে অনেক দেশই বড় শক্তির চাপের মধ্যে নিজেদের নীতি রক্ষা করতে চায়। তাদের জন্য ইউরোপ একটি গ্রহণযোগ্য কেন্দ্র হতে পারে, যদি ইউরোপ নিজেকে একক দুর্গে পরিণত না করে বরং সহযোগিতার মঞ্চ তৈরি করে।
সম্ভাব্য অংশীদারের তালিকাও ছোট নয়। ইউরোপের সবচেয়ে কাছের অংশীদার হতে পারে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য। এর বাইরে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। এসব দেশ উচ্চ আয়ের, স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং বহুপাক্ষিক নিয়ম, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে সাধারণত ইউরোপের সঙ্গে মিল রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ এসব দেশ একত্র হলে তাদের মোট দেশজ উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড় হবে এবং সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা চীনের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
কিন্তু এমন একটি জোট নিজে নিজে তৈরি হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখানে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। একটি সম্ভাব্য কাঠামো হতে পারে উন্মুক্ত ও স্থিতিশীল অর্থনীতির সমঝোতা জোট। এর শুরুতেই কঠিন আনুষ্ঠানিক চুক্তির প্রয়োজন নেই। বরং প্রথম ধাপ হতে পারে ব্রাসেলসে একটি সম্মেলন আয়োজন করা, যেখানে অংশীদার দেশগুলো একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণ করবে। সেই অঙ্গীকারের মূল কথা হবে—বাণিজ্য বা শিল্পনীতির এমন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করা, যা অন্য অংশীদার দেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ব্যবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা হবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ কোনো আইন বা নীতি করার আগে অংশীদারদের মতামত চাইতে পারে। পাশাপাশি এসব দেশকে ইউরোপের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও কর্মপর্যায়ের আলোচনায় ভোটাধিকার ছাড়া অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে ইউরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু অংশীদারদের উদ্বেগও আগেই জানা যাবে। ফলে নীতিগত সংঘাত, ভুল বোঝাবুঝি এবং হঠাৎ বাণিজ্যিক ক্ষতির ঝুঁকি কমবে।
আইনগত দিক থেকেও ইউরোপের কাঠামো এমন নমনীয় ব্যবস্থাকে জায়গা দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির ২১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইউনিয়ন তৃতীয় দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, যৌথ পদক্ষেপ এবং বিশেষ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। সুইজারল্যান্ডের মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক এই নীতির উদাহরণ। গবেষণার ক্ষেত্রেও হরাইজন ইউরোপ কর্মসূচিতে কয়েকটি অ-সদস্য দেশ সহযোগী সদস্য হিসেবে অংশ নেয়, অর্থায়ন করে এবং গবেষণা কর্মসূচির নকশায় ভূমিকা রাখে।
তবে এই নতুন সহযোগিতা কার্যকর করতে হলে ইউরোপকে নিজের কিছু নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। উদাহরণ হিসেবে শিল্প ত্বরান্বয়ন আইনের কথা বলা যায়, যা ইউরোপীয় কমিশন চলতি বছরের মার্চে প্রস্তাব করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ইউরোপে তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পভিত্তি রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও নিজেদের শিল্প রক্ষায় এমন নীতি নিয়েছে। কিন্তু ইউরোপের বৈশ্বিক শিল্প উৎপাদনে অংশ মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ এবং তা কমছে। এই বাস্তবতায় সব সরবরাহ ব্যবস্থা ইউরোপের ভেতরে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
এখানে দরকার নতুন ভাবনা। শুধু “ইউরোপে তৈরি” ভাবনার বদলে “ইউরোপের সঙ্গে তৈরি” ধারণা গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ সমমনা অংশীদার দেশগুলো থেকে আসা উপকরণ, প্রযুক্তি ও কাঁচামালকে ইউরোপীয় উৎপাদনের অংশ হিসেবে দেখা। এতে একদিকে সরবরাহ ব্যবস্থা বিস্তৃত ও নিরাপদ হবে, অন্যদিকে অংশীদারদের সঙ্গে আস্থা বাড়বে।
এই ধারণার বাস্তব ভিত্তিও আছে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আছে। দক্ষিণ কোরিয়া চিপ উৎপাদনে শক্তিশালী। সুইজারল্যান্ড জীবপ্রযুক্তিতে অগ্রগামী। ইউরোপ যদি এসব সক্ষমতাকে নিজের শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে তার শিল্পভিত্তি আরও কার্যকরভাবে শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে এসব দেশের বাজার ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তাই সহযোগিতাকে বাধা নয়, বরং কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা উচিত।
কেউ বলতে পারেন, ইউরোপের ভেতরের সরবরাহ বাইরের অংশীদারের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু সব বাইরের দেশ একই রকম নয়। সমমনা গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের কাছ থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। এসব দেশও জানে, একা একা বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে কঠিন। তাই তারা ইউরোপের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইস্পাত আমদানির নতুন কঠোর নিয়ম। নতুন ব্যবস্থায় শুল্কমুক্ত আমদানির কোটা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। সমস্যা হলো, এই নিয়ম অনেক সমমনা বাণিজ্য অংশীদারের ওপরও প্রযোজ্য, এমনকি যাদের সঙ্গে ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আছে তাদের ক্ষেত্রেও। নরওয়েকে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, কিন্তু অন্য অংশীদাররা এমন সুবিধা পাচ্ছে না। যদি নতুন সমঝোতা জোট গঠিত হয়, তাহলে এসব দেশকে এই কঠোর ব্যবস্থার বাইরে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, নীতির নকশা পর্যায় থেকেই পরামর্শ শুরু করা। এখন অনেক সময় দেখা যায়, একটি দেশ বা ব্লক নিজের স্বার্থে নীতি করে, পরে তার প্রভাব অন্যদের ওপর পড়ে। এতে সম্পর্কের মধ্যে বিরক্তি ও অনাস্থা তৈরি হয়। যদি শুরু থেকেই অংশীদারদের মতামত নেওয়া হয়, তাহলে নীতি আরও বাস্তবসম্মত হবে, ক্ষতি কমবে এবং যৌথ পদক্ষেপের সুযোগ বাড়বে।
ইউরোপের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে আছে সীমিত সার্বভৌমত্বের সংকীর্ণ ধারণা—যেখানে ইউরোপ নিজেকে একা শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে এবং সব শিল্প নিজ ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনার অসম্ভব স্বপ্ন দেখবে। অন্যদিকে আছে উন্মুক্ত, স্থিতিশীল ও সমমনা অর্থনীতির একটি বিস্তৃত সম্প্রদায় গড়ে তোলার পথ। প্রথম পথটি আত্মরক্ষামূলক, কিন্তু সীমাবদ্ধ। দ্বিতীয় পথটি সহযোগিতামূলক, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
এখানে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে ইউরোপকে নতুন বৈশ্বিক আধিপত্যে বসানো নয়। সেটি সম্ভবও নয়, কাম্যও নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক ধরনের নেতৃত্ব দেওয়া, যা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না; বরং অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে এগোয়। আজকের বিশ্বে যখন বড় শক্তিগুলো কখনো অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করছে, কখনো কৌশলগত চাপ তৈরি করছে, তখন এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন আরও বেশি।
ইউরোপ যদি এই সুযোগ বুঝতে পারে, তাহলে সে শুধু নিজের নিরাপত্তা বা শিল্পভিত্তি রক্ষা করবে না; বরং পশ্চিমা বিশ্বে নতুন ধরনের নেতৃত্বের মডেল তৈরি করতে পারবে। সেই মডেল হবে আধিপত্যের নয়, আস্থার; একক সিদ্ধান্তের নয়, পরামর্শের; সুরক্ষাবাদের নয়, স্থিতিশীল উন্মুক্ততার। পরিবর্তিত বিশ্বে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার সামরিক ক্ষমতা নয়, বরং নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তোলার ক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত ইউরোপের প্রশ্নটি হলো—সে কি নিজেকে একা বড় শক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করবে, নাকি সমমনা দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে? যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার যুগে দ্বিতীয় পথটিই বেশি বাস্তবসম্মত। কারণ আজকের বিশ্বে টিকে থাকতে শুধু বড় হওয়া যথেষ্ট নয়; দরকার বিশ্বাসযোগ্য হওয়া, সংযোগ গড়া এবং এমন নেতৃত্ব দেওয়া, যেখানে অন্যরা অংশীদার হিসেবে নিজেদের সম্মানিত বোধ করে।

