ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে এবার চোখ আঙ্কারার দিকে। ৭-৮ জুলাই জোটের নেতারা যখন তুরস্কের রাজধানীতে মিলিত হবেন, তখন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নিঃসন্দেহে নিজের দেশকে স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। তুরস্ক অবশ্যই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে সন্দেহ কম। কিন্তু দেশটি কতটা স্থিতিশীল, কতটা আত্মবিশ্বাসী, আর কতটা গণতান্ত্রিক—সেই প্রশ্ন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
তুরস্ক এমন এক ভূগোলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধ, সংঘাত, শরণার্থী সংকট, জ্বালানি রাজনীতি এবং সামরিক ভারসাম্য একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা। সিরিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে প্রতিটি পরিবর্তনের ছায়া তুরস্কের ওপর পড়ে। ফলে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি শুধু দেশটির নাগরিকদের বিষয় নয়। এটি ন্যাটো, ইউরোপ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এরদোয়ান ২০০৩ সাল থেকে তুরস্কের রাজনীতির কেন্দ্রে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ক্ষমতার প্রধান মুখ। তুর্কি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে নির্বাচিত কোনো নেতা এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকেননি। এই দীর্ঘ শাসন একদিকে তাকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ক্রমেই একজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন আর শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়। প্রশ্ন হলো, তুরস্কের নাগরিকরা কি সত্যিই স্বাধীন ও ন্যায্য পথে পরিবর্তন আনার সুযোগ পাবেন?
দেশটির বহু মানুষ আজ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অর্থনীতি চাপের মুখে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের আয় ও সঞ্চয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পরিবারগুলো আগের মতো নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারছে না। তরুণদের বড় অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী নয়। চাকরি, শিক্ষা, জীবনমান এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এই অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা।
কোনো সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অনেক আছে। কিন্তু নাগরিকরা যখন বিশ্বাস হারাতে শুরু করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ন্যায্য, তখন সংকট গভীর হয়। তুরস্কে আজ সেই আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর সমান মাঠে হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক চাপ এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনে তুরস্কের ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্টি দেশটির প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসে। এটি ছিল শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অসন্তোষের প্রকাশ। ভোটাররা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তারা পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুঁজছেন। কিন্তু সরকার সেই বার্তাকে রাজনৈতিক আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে না দেখে বিরোধীদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামওলু এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তিনি এরদোয়ান-সমর্থিত প্রার্থীদের বারবার পরাজিত করেছেন তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহরে। তাই তাকে শুধু একজন মেয়র হিসেবে দেখা হয় না; অনেকের চোখে তিনি ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির সম্ভাব্য মুখ। কিন্তু বর্তমানে তিনি কারাগারে। শুধু তিনিই নন, ৩০ জনের বেশি বিরোধী মেয়র বিচার-পূর্ব আটক অবস্থায় রয়েছেন। প্রসিকিউটররা এমন শাস্তির দাবি করছেন, যার হিসাব বছর নয়, সহস্রাব্দে মাপা হচ্ছে—এমন অভিযোগ বিরোধীদের। এই পরিস্থিতি বিচার ও রাজনীতির সীমানাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে।
ন্যাটো সম্মেলনের আগের দিনগুলোতে সরকারের অবস্থান আরও কঠোর বলে মনে হয়েছে। আঙ্কারায় শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। কিন্তু যেখানে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে এমন অভিযান স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি করে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, পরিবেশবাদী এবং বয়স্ক নাগরিক থাকার খবর পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করেছে।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, শহরের দৃশ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও আলোচনায় এসেছে। বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্রে যাওয়ার পথে কিছু স্থানে পর্দা ও প্রতিবন্ধক বসানোর খবর এসেছে, যাতে অর্থনৈতিক দুরবস্থার দৃশ্য বাইরে থেকে আসা অতিথিদের চোখে না পড়ে। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে তা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, সরকার বাস্তব সংকট সমাধানের চেয়ে দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগী।
এরদোয়ান আঙ্কারা সম্মেলনে তুরস্ককে শক্তিশালী ও অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরবেন। তিনি বলতে চাইবেন, অস্থির বিশ্বে তুরস্ক ছাড়া পশ্চিমা নিরাপত্তা ভাবা কঠিন। এই বক্তব্যের বাস্তব ভিত্তি আছে। তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র শুধু অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য হয় না। নির্ভরযোগ্যতার জন্য দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক বৈধতা।
ক্ষমতায় থাকা আর বৈধতা পাওয়া এক জিনিস নয়। কোনো সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আদালত, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সম্পদ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব রাখতে পারে। কিন্তু এসব দিয়ে নাগরিকের আস্থা জোর করে তৈরি করা যায় না। ভয় দিয়ে শাসন চালানো যায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা গড়া যায় না। দমন-পীড়ন কখনো কখনো শৃঙ্খলার ভান তৈরি করে, কিন্তু তা নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি নয়।
তুরস্ক এখন গভীর মেরুকরণের মধ্যে আছে। সমাজ ক্লান্ত। অর্থনীতি চাপগ্রস্ত। রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ। একদল মানুষ সরকারকে স্থিতিশীলতার প্রতীক মনে করে, অন্যদল মনে করে এই শাসনব্যবস্থাই অস্থিরতার উৎস। এই বিভক্তি যত বাড়বে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তি তত দুর্বল হবে। অথচ তুরস্কের মতো দেশের জন্য অভ্যন্তরীণ ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি শুধু নিজের সীমান্ত রক্ষাই করে না, বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্যের অংশ হিসেবেও কাজ করে।
তুরস্কের গুরুত্ব ন্যাটোর কাছে নতুন কিছু নয়। দেশটি সামরিকভাবে শক্তিশালী। কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সংযোগস্থলে তার অবস্থান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সিরিয়ার অস্থিরতা, ইরানকেন্দ্রিক উত্তেজনা—এসব ইস্যুতে তুরস্ককে উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু এই গুরুত্বকে যদি সরকার অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংকট আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা ন্যাটোর জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
ন্যাটোর সদস্যরা প্রায়ই নিরাপত্তাকে সামরিক ভাষায় বোঝে। সেনাবাহিনী, সীমান্ত, অস্ত্র, ঘাঁটি, কৌশল—এসব বিষয় সামনে আসে। কিন্তু নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির বিষয় নয়। রাজনৈতিক বৈধতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানও নিরাপত্তার অংশ। একটি বড় সামরিক শক্তি যদি ভেতরে ভেতরে আস্থাহীনতা, দমন এবং বৈধতার সংকটে ভোগে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জোটের জন্যও দুর্বলতা তৈরি করে।
তুরস্কের প্রায় ৯ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও বিষয়। এত বড় জনগোষ্ঠী, এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং এত বড় সামরিক ভূমিকা নিয়ে কোনো দেশ অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংকটকে অনির্দিষ্টকাল আলাদা করে রাখতে পারে না। ভেতরের চাপ একসময় বাইরের নীতিতেও প্রতিফলিত হয়। যখন বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, যখন বিরোধী কণ্ঠকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখানো হয়, যখন নাগরিক আন্দোলনকে অপরাধের চোখে দেখা হয়, তখন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পশ্চিমা মিত্রদের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা। তারা কি শুধু বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তুরস্ককে বুঝবে, নাকি তুরস্কের সমাজ, জনগণ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকেও গুরুত্ব দেবে? সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু দেশ ও জনগণ থেকে যায়। তুরস্কের মানুষ যদি আরও স্বাধীন, ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ চায়, তাহলে সেই আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা ন্যাটোর জন্যও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
তুরস্কের প্রয়োজন শুধু শক্তিশালী নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজন এমন বিচারব্যবস্থা, যেখানে আইন রাজনৈতিক সুবিধার হাতিয়ার হবে না। প্রয়োজন এমন নির্বাচন, যেখানে বিরোধী প্রার্থী ভয় ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। প্রয়োজন এমন প্রশাসন, যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। প্রয়োজন এমন পররাষ্ট্রনীতি, যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দরকষাকষির ওপর নয়, স্থিতিশীল নীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দাঁড়াবে।
আঙ্কারা সম্মেলন তাই শুধু ন্যাটোর আরেকটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়। এটি তুরস্কের বর্তমান বাস্তবতা দেখার একটি সুযোগ। এরদোয়ান হয়তো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলবেন, তুরস্ক ছাড়া পশ্চিমা নিরাপত্তা অসম্পূর্ণ। কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু আরেকটি কথাও সমান সত্য—গণতন্ত্র ছাড়া তুরস্কের স্থিতিশীলতা অসম্পূর্ণ। আর স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘদিন নির্ভরযোগ্য মিত্র হতে পারে না।
আজ তুরস্ক এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত নয়, জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছাও। দমন, আটক, বিচারিক চাপ ও দৃশ্য নিয়ন্ত্রণ দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে বিরোধিতা দুর্বল করা যায়। কিন্তু মানুষের পরিবর্তনের দাবি মুছে ফেলা যায় না। সেই দাবি কখনো প্রকাশ্য হয়, কখনো নীরব থাকে; কিন্তু তা অদৃশ্য হয়ে যায় না।
ন্যাটোর দরকার এমন তুরস্ক, যে বাইরে শক্তিশালী এবং ভেতরে ন্যায়ভিত্তিক। দরকার এমন তুরস্ক, যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে, আবার নিজের নাগরিকদের অধিকারও সম্মান করবে। দরকার এমন তুরস্ক, যে শুধু সামরিকভাবে নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও বিশ্বাসযোগ্য হবে। কারণ প্রকৃত শক্তি শুধু সীমান্তে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেও তৈরি হয়। আর সেই শক্তির ভিত্তি হলো গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা।

