মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট বহু দশক ধরে এক গভীর অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। এই সংকটকে কখনো নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, কখনো কূটনৈতিক অচলাবস্থা হিসেবে, আবার কখনো আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে—ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি বা স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমাতে চায় এবং নিজেকে বারবার এই অঞ্চলের যুদ্ধ-সংকটে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচাতে চায়, তাহলে তাকে শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করলেই চলবে না। তাকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়াকে আবারও গুরুত্বের কেন্দ্রে আনতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন চাপ
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক অভূতপূর্বভাবে আলোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৪০ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি ঠেকাতে ভোট দেন। মাত্র এক বছর আগেও এমন ঘটনা কল্পনা করা কঠিন ছিল। গাজা, ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলি সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অস্বস্তি বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধের পর এই সমালোচনা শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যেও অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র একটি অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—ইসরায়েলের প্রতি পুরোনো ধরনের নিঃশর্ত সমর্থন কি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে?
তবে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন হলেও সেটি একা যথেষ্ট নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার শিকড় শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের মধ্যে নেই। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্ন উপেক্ষা করলে এই অঞ্চল আবারও সংঘাতে ফিরে যাবে। ০৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলা এবং তার পরবর্তী যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে ভয়াবহভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্ন এড়িয়ে স্থিতিশীলতা অসম্ভব
মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার উৎস ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নয়। কিন্তু এই সংঘাত অমীমাংসিত থাকলে অঞ্চলটি কখনো সত্যিকার অর্থে স্থিতিশীল হতে পারবে না। কারণ ফিলিস্তিনিরা নিজেদের শাসন করার বাস্তব সুযোগ না পেলে হতাশা, ক্ষোভ ও সহিংস রাজনীতি আরও বাড়বে।
গত ১৫ বছর ধরে ওয়াশিংটন ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আলাদা কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেনি। বরং বিষয়টিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের একটি পার্শ্বপ্রশ্ন হিসেবে扱 করেছে। শান্তি আলোচনা যখন হয়েছে, তখনই ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ সামনে এসেছে; বাকি সময় প্রায় সব সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করেছে।
এই নীতি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি অপেক্ষাকৃত শান্ত ও স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য চায়, তাহলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের রাষ্ট্রগঠনে বাস্তব সহায়তা দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু যুদ্ধ থামানো নয়, যুদ্ধের কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।
অতীতের সফলতার শিক্ষা
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠনের ধারণা নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকে অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। পরে ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী সালাম ফাইয়াদের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার দেখা যায়। তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা বাড়ান, নিরাপত্তা বাহিনীকে পেশাদার করার চেষ্টা করেন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী করে তোলার পথে এগিয়ে নেন।
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তায় পশ্চিম তীরে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। ফাইয়াদের প্রথম চার বছরে পশ্চিম তীরের মোট দেশজ উৎপাদন গড়ে প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক মত দেয় যে, ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলো নিকট ভবিষ্যতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত অবস্থানে আছে।
জনসমর্থনও তখন তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ছিল। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ দুই রাষ্ট্র কাঠামোকে সমর্থন করেছিল এবং ৬০ শতাংশের বেশি কূটনীতি ও অহিংস পথকে সমর্থন করেছিল। এটি দেখায়, যখন শাসনব্যবস্থা কার্যকর হয় এবং রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনা বাস্তব মনে হয়, তখন সাধারণ মানুষ সংঘাতের বদলে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঝোঁকে।
কেন সেই অগ্রগতি থেমে গেল
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তখনকার অগ্রগতিকে অনেকেই শুধু সালাম ফাইয়াদের প্রযুক্তিবিদসুলভ নেতৃত্বের ফল বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। তার সফলতার পেছনে রাজনৈতিক বৈধতা, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং ইসরায়েলের কিছু সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মাহমুদ আব্বাস ৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। এই জনসমর্থন ফাইয়াদকে কঠিন সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ দেয়। একই সময়ে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার বদলে তুলনামূলকভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি কর রাজস্ব স্থানান্তর সহজ করেন এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর কিছু বাধা শিথিল করেন।
কিন্তু ২০০৯ সালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফেরার পর সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তার সরকার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করার বদলে ধীরে ধীরে দুর্বল করে। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ বাড়ে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বাড়ে এবং মাঝে মাঝে ফিলিস্তিনি কর রাজস্ব আটকে দেওয়া হয়।
এই নীতির ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মূল রাজনৈতিক বার্তা—সহযোগিতা ও অহিংস পথ রাষ্ট্রগঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে—ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। অন্যদিকে সশস্ত্র প্রতিরোধের ভাষা নিয়ে হামাস আরও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
গাজা, হামাস ও ব্যর্থ নীতির ফল
২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে গাজায় হামাসের শাসন চলতে থাকে। ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে বিভাজন গভীর হয়—একদিকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে গাজার হামাস।
নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনি মধ্যপন্থীদের দুর্বল করেছেন বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে কাতার থেকে বিপুল অর্থ গাজায় হামাসের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে যে শক্তিগুলো আলোচনা ও রাষ্ট্রগঠনের পথে যেতে চাইত, তারা দুর্বল হয়; আর যেসব শক্তি সশস্ত্র প্রতিরোধকে প্রধান পথ বলে তুলে ধরে, তারা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়।
২০১৩ সালে সালাম ফাইয়াদ পদত্যাগ করেন। আন্তর্জাতিক দাতারা হতাশ হয়ে সহায়তা কমিয়ে দেয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি, দুর্বলতা ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগে জনগণের আস্থা হারাতে থাকে।
ট্রাম্প যুগে দূরত্ব আরও বাড়ে
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তার প্রশাসন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য প্রায় সব যুক্তরাষ্ট্রীয় সহায়তা বন্ধ করে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেয়, ফিলিস্তিনিদের জন্য কার্যত দূতাবাসের ভূমিকা পালন করা কনস্যুলেট বন্ধ করে এবং ওয়াশিংটনে ফিলিস্তিনিদের কূটনৈতিক মিশনও বন্ধ করে দেয়।
এই সময় ইসরায়েলি রাজনীতি আরও ডানদিকে সরে যায়। বসতি সম্প্রসারণ বাড়ে এবং গুরুতর শান্তি আলোচনার বদলে সংযুক্তিকরণের ভাষা জোরালো হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের কাছে কূটনৈতিক পথ আরও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।
০৭ অক্টোবর ২০২৩-এর এক মাস আগে পশ্চিম তীর ও গাজায় জরিপে ৭৮ শতাংশ ফিলিস্তিনি মাহমুদ আব্বাসের পদত্যাগ দাবি করেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সশস্ত্র প্রতিরোধকে সমর্থন করছিল। এটি শুধু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার চিত্র নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশারও প্রতিফলন।
ব্যালট না বুলেট: পথ কোনটি?
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠনের নতুন প্রচেষ্টা শুরু করতে হলে প্রথম কাজ হতে পারে রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠন। মাহমুদ আব্বাস এখন ৯০ বছর বয়সী। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরে আইনসভা নির্বাচন এবং ২০২৭ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে পারে। ২০০৬ সালের পর এটি হবে প্রথম ফিলিস্তিনি জাতীয় নির্বাচন।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাপ দেওয়া। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে হবে, যাতে পূর্ব জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সব জায়গায় প্রচারণা ও ভোটের সুযোগ নিশ্চিত হয়।
অনেক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা আশঙ্কা করেছেন যে নির্বাচন হলে হামাস শক্তিশালী হতে পারে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস জিতেছিল, তাই এই ভয় অমূলক নয়। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া আরও বিপজ্জনক। এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বৈধতা আরও কমে এবং হামাস নিজেকে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়।
সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত নির্বাচন ঠেকানো নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বৈধ, জবাবদিহিমূলক ও সক্ষম নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে। অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে অহিংস রাজনীতির প্রতিশ্রুতি রাখা যেতে পারে। এতে হামাসকে হয় রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে হবে, নয়তো নির্বাচনের বাইরে থাকতে হবে।
রাষ্ট্র স্বীকৃতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—যদি ফিলিস্তিনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই স্বীকৃতি রাতারাতি বাস্তবতা বদলে দেবে না। কিন্তু এটি নতুন ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে জনগণের কাছে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে সাহায্য করবে।
শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নিজের আরোপিত আইনি বাধাগুলোও সরাতে হবে। টেইলর ফোর্স আইনসহ কয়েকটি আইন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত বন্দিদের অর্থপ্রদান বন্ধের দিকে অগ্রগতি করেছে কি না, সেটি স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। যদি অগ্রগতি প্রমাণিত হয়, তাহলে এসব বাধা তুলে নেওয়া উচিত।
নতুন স্বীকৃত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে ওয়াশিংটনে দূতাবাস খোলার সুযোগ দিতে হবে। কূটনৈতিক উপস্থিতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রকে বাস্তব অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা যায় না।
ইসরায়েলের ভূমিকা ছাড়া অগ্রগতি অসম্ভব
যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু ইসরায়েলের অংশগ্রহণ ছাড়া ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রগঠন সম্ভব নয়। বর্তমান নেতানিয়াহু সরকারের অতি ডানপন্থী জোট ফিলিস্তিনি সমাজ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার ওপর গভীর ক্ষতি করেছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর রাজস্ব পুরোপুরি আটকে রেখেছে, যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এর ফলে সরকারি কর্মীদের পূর্ণ বেতন দেওয়া যায়নি, ঋণ বেড়েছে এবং জরুরি ওষুধের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের পর যদি তুলনামূলক বাস্তববাদী সরকার আসে, তাহলে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অনুরোধ করে থেমে থাকলে চলবে না। ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনি কর রাজস্ব আটকে রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অর্থনৈতিক সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করা।
১৯৯৪ সালের প্যারিস প্রোটোকল ফিলিস্তিনি অর্থনীতির একটি বড় নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে রেখেছে। কোনো সরকার নিজের রাষ্ট্র গড়তে পারে না, যদি তার অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রণ অন্য রাষ্ট্রের হাতে থাকে এবং সেই রাষ্ট্র সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তাকে দুর্বল করে।
চলাচল, বসতি ও সহিংসতার প্রশ্ন
কর রাজস্বই একমাত্র সমস্যা নয়। ০৭ অক্টোবরের পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি চলাচল নিষেধাজ্ঞা অনেক বেড়েছে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কৃষিজমিতে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের কাজের সুযোগ কমেছে। সার্বভৌমত্বের একটি মৌলিক অংশ হলো নিজ ভূখণ্ডে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার। কিন্তু যখন ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবন নিজেদের সরকারের বদলে চেকপোস্ট ও রাস্তা বন্ধের ওপর নির্ভর করে, তখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে জনগণ অকার্যকর হিসেবেই দেখে।
আরও বড় ক্ষতি করছে বসতি সম্প্রসারণ ও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা। ২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েলি সরকার ৫০,০০০-এর বেশি বসতি ইউনিট অনুমোদন করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ৫,৩০০-এর বেশি হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন কিছু সহিংস বসতিস্থাপনকারী ও তাদের সহায়ক সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। বর্তমানে সহিংস হামলার হার সেই নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এই পরিস্থিতিতে বসতি সম্প্রসারণ ও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। শুধু বিবৃতি দিয়ে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে।
গাজা থেকে রাষ্ট্রগঠনের পথে
গাজা যুদ্ধ, ইরান ও লেবানন সংশ্লিষ্ট সংঘাত—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সরকারগুলো বুঝেছে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট উপেক্ষা করলে তা একসময় বিস্ফোরিত হয় এবং সবার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠনে সক্রিয় হতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সৌদি আরব গত দুই বছরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদানের সংস্কারে বিনিয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত শর্তযুক্ত আর্থিক সহায়তা ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে এই প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা।
তবে শুধু পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করলেই হবে না। একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য গাজা ও পশ্চিম তীরকে বৈধ ফিলিস্তিনি শাসনের অধীনে পুনরায় একত্র করতে হবে।
ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ শেষ করার ২০ দফা পরিকল্পনা, যা মিসর, কাতার ও তুরস্কের সহায়তায় আলোচিত হয়েছিল, একটি সম্ভাব্য পথনকশা দিয়েছে। সেখানে সংস্কার করা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গাজার শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি আনার প্রাথমিক সাফল্যের পর পরিকল্পনাটি স্থবির হয়ে পড়েছে।
হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে যদি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বশর্ত বানানো হয়, তাহলে প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে। কারণ হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, যোদ্ধাদের বেসামরিক জীবনে ফেরানো এবং পুনর্গঠন একটি ধাপে ধাপে চলা দীর্ঘ প্রক্রিয়া হতে পারে। তাত্ক্ষণিক নিরস্ত্রীকরণের ওপর অনড় থাকার ফলে হামাস ক্ষমতায় থেকে যায় এবং ইসরায়েল গাজায় থাকার অজুহাত পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মিসর, তুরস্ক ও কাতারের সঙ্গে কাজ করে হামাসকে ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনায় রাজি করানো এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের কাছ থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি নেওয়া।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিকল্প নেই
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা আছে, দুর্নীতির অভিযোগ আছে, জনগণের আস্থার সংকট আছে। তবু হামাসের বিকল্প হিসেবে এখনো এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাকে সংস্কার করে গাজা ও পশ্চিম তীরের বৈধ শাসনব্যবস্থার ভিত্তি করা যেতে পারে।
ইসরায়েল যদি গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা না মানে, তাহলে বাস্তবসম্মত বিকল্প তৈরি হবে না। এতে হয় হামাস আংশিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, নয়তো ইসরায়েল অনির্দিষ্টকালের জন্য গাজায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। দুই অবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে।
তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের কাছে স্পষ্ট করতে হবে—ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে হামাসের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। যদি ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহার করে এমন নীতি চালায় যা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে, তাহলে ওয়াশিংটনের উচিত সেই অস্ত্র ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা।
কেন রাষ্ট্রগঠন আবারও জরুরি
ইরাক ও আফগানিস্তানের ব্যর্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রগঠন ধারণাটি জনপ্রিয় নয়। কিন্তু ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। এখানে রাষ্ট্রগঠন মানে বাইরে থেকে কোনো সমাজকে জোর করে বদলে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক কাঠামো দেওয়া, যারা বহুদিন ধরে রাষ্ট্রহীনতা, দখল, বিভাজন ও সংঘাতের মধ্যে আছে।
যদি ফিলিস্তিনিদের সামনে বৈধ রাজনৈতিক পথ না থাকে, তাহলে সহিংস পথের দাবিদাররা আরও শক্তিশালী হবে। একইভাবে যদি ইসরায়েলের অতি ডানপন্থী রাজনীতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে ক্রমাগত বন্ধ করে দেয়, তাহলে সংঘাত চলতেই থাকবে।
রাষ্ট্রগঠন তাই শুধু ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্ন নয়; এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।
সামনে কি সুযোগ আছে?
বর্তমান পরিস্থিতি কঠিন। গাজায় ভয়াবহ মানবিক দুর্দশা চলছে। পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে। ইসরায়েল এখনো অতি ডানপন্থী সরকারের নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্প তার দুই মেয়াদেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নে বিশেষ আগ্রহ দেখাননি।
তবু কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জোট ৬১ নেসেট আসন পাওয়ার মতো অবস্থানে নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাহমুদ আব্বাস নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মুস্তাফা একজন সক্ষম প্রযুক্তিবিদ হিসেবে ফাইয়াদের মতো ভূমিকা রাখতে পারেন, যদি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এখন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ইসরায়েল প্রশ্নে ভাঙন দেখা যাচ্ছে। নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের অন্তত একটি, এমনকি দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারে। এমন অবস্থায় ট্রাম্প নিজের উত্তরাধিকার শক্তিশালী করতে কোনো বড় বৈদেশিক নীতি সাফল্য খুঁজতে পারেন। গাজায় যুদ্ধবিরতির পর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠনের পথে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া সেই সুযোগ হতে পারে।
তবে ট্রাম্প না করলেও পরবর্তী যেকোনো প্রেসিডেন্টের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠন রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ এই সংকট আর কেবল একটি দূরের আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি চাইলে শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়। শুধু অস্ত্রবিরতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা সাময়িক কূটনৈতিক চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করবে না। মূল প্রশ্ন হলো—ফিলিস্তিনিরা কি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের সুযোগ পাবে?
দুই রাষ্ট্র সমাধান বাঁচাতে হলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে কাগজের ধারণা থেকে বাস্তব রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপ দিতে হবে। এর জন্য দরকার নির্বাচন, বৈধ নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, গাজা ও পশ্চিম তীরের পুনরেকত্রীকরণ, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ, চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করার নীতি ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার মূল্য দিয়েছে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষ, ইসরায়েলি জনগণ, যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো অঞ্চল। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি আবারও পুরোনো ভুল করবে, নাকি সত্যিকারের শান্তির জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রগঠনের কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথ বেছে নেবে?

