আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের ছোট দেশ বুরকিনা ফাসো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। দেশটির তরুণ সামরিক নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে শুধু বুরকিনা ফাসোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন না, বরং আফ্রিকায় দীর্ঘদিনের পশ্চিমা প্রভাব, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।
২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ত্রাওরে অনেক আফ্রিকান তরুণের কাছে ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।
অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নীতিনির্ধারক তাকে একজন অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক শাসক হিসেবে দেখছেন, যিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন।
তবে “পশ্চিমা বিশ্ব তাকে হত্যা করতে চায়”—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ত্রাওরের বিরুদ্ধে হামলার চেষ্টা বা নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এলেও এর সঙ্গে সরাসরি কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রকে যুক্ত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বাস্তবতা হলো, তার রাজনৈতিক অবস্থান, পররাষ্ট্রনীতি এবং সংস্কারমূলক পদক্ষেপ পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করেছে। এ কারণেই তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইব্রাহিম ত্রাওরের উত্থান বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে বুরকিনা ফাসোর ইতিহাসের দিকে। একসময় ফরাসি উপনিবেশ “আপার ভোল্টা” নামে পরিচিত দেশটি ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পরও ফ্রান্সের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল। আফ্রিকার অনেক সাবেক ফরাসি উপনিবেশের মতো বুরকিনা ফাসোর রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্যারিসের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সাহেল অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর ফ্রান্স সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ফ্রান্স “অপারেশন বারখান”সহ একাধিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। শুরুতে এসব অভিযানের মাধ্যমে কিছু সাফল্য এলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগণের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। অনেকের ধারণা, দীর্ঘদিনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অসন্তোষই পশ্চিমা বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
ত্রাওরে এই জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন। ক্ষমতায় এসে তিনি ঘোষণা করেন, বুরকিনা ফাসোর নিরাপত্তা ও উন্নয়নের বিষয়ে দেশটি নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ২০২৩ সালে ফরাসি সেনাদের দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক আফ্রিকান নাগরিক এটিকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
ত্রাওরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হলো—আফ্রিকার সম্পদ ও ভবিষ্যৎ আফ্রিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। তিনি দেশের খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে সোনা খাতের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। বুরকিনা ফাসো আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোনা উৎপাদনকারী দেশ হলেও দীর্ঘদিন ধরে খনি খাতে বিদেশি কোম্পানির প্রভাব ছিল। ত্রাওরে সরকার খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তার সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেওয়া। বুরকিনা ফাসোর অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষকদের জন্য কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ, উৎপাদন সহায়তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে রাস্তা নির্মাণ ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে ত্রাওরের শাসন নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। তিনি কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেননি; সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার সরকারের অধীনে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জঙ্গিবাদ দমনের নামে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ত্রাওরের দূরত্বের অন্যতম কারণ তার পররাষ্ট্রনীতি। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন এবং ফ্রান্সের বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজছেন। আফ্রিকার কয়েকটি সামরিক সরকার রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করায় পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বিগ্ন। কারণ সাহেল অঞ্চল শুধু নিরাপত্তার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এই অঞ্চলে সোনা, ইউরেনিয়াম, তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ রয়েছে।
বিশেষ করে ফ্রান্সের জন্য পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলো ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকায় ফরাসি প্রভাব কমে যাওয়া প্যারিসের জন্য একটি বড় ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, রাশিয়া ও চীন আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নিতে পারে।
তবে ত্রাওরের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু পশ্চিমা বিরোধিতা কাজ করছে না; বরং আফ্রিকার বহু তরুণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও বড় ভূমিকা রাখছে। ঔপনিবেশিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব এবং দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে অনেক মানুষ এমন নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, যারা আত্মনির্ভরতা, জাতীয় মর্যাদা এবং সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন।
ইব্রাহিম ত্রাওরে তাই একই সঙ্গে আশা ও বিতর্কের প্রতীক। তার সমর্থকদের কাছে তিনি বুরকিনা ফাসোর প্রয়াত নেতা থমাস সানকারার আদর্শ অনুসরণকারী একজন সংস্কারক নেতা, যিনি বিদেশি প্রভাব কমিয়ে দেশের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে চান। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি একজন সামরিক শাসক, যিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতায় রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ত্রাওরের গুরুত্ব এখানেই—তিনি শুধু একজন বুরকিনা ফাসোর নেতা নন; তিনি আফ্রিকার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব, রাশিয়া-চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের দাবি—সবকিছু মিলিয়ে তার নেতৃত্ব একটি বড় বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের দাবি প্রমাণিত না হলেও, এটি সত্য যে ত্রাওরের নীতি বহু শক্তিশালী দেশের স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করেছে। আগামী দিনে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তিনি কি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ইতিহাসে একজন সফল নেতা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারবেন, নাকি আফ্রিকার বহু সামরিক নেতার মতো ক্ষমতার সংকটেই আটকে যাবেন।
বুরকিনা ফাসোর ভবিষ্যৎ শুধু একটি দেশের ভবিষ্যৎ নয়; এটি আফ্রিকায় নতুন ধরনের নেতৃত্ব, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং উপনিবেশ-পরবর্তী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
তাই ইব্রাহিম ত্রাওরেকে ঘিরে বিতর্ক যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো—তার নীতি পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আর সেখানেই এই আলোচনার মূল সূত্র।

