এতদিন ইরানের হুমকির প্রধান বিষয় ছিল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও তৈরি হয়েছিল নতুন উত্তেজনা। তবে এবার ইরানের এক প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের হিসাব আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলে ইরান এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব বহু বছর ধরে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ, তেহরানের সামরিক হুমকির আলোচনায় এবার প্রকাশ্যেই উঠে এসেছে পরমাণু অস্ত্রের প্রসঙ্গ।
ইরানের আহভাজ শহরের জুমার নামাজের খতিব ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ নবি মুসাভিফার্দ শুক্রবারের এক খুতবায় এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ যদি ইরানের বিরুদ্ধে কথিত ‘অবকাঠামো যুদ্ধ’ বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেবে। তাঁর ভাষায়, ‘যদি আমাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে আমরা বাধ্য হয়ে পরমাণু অস্ত্রের দিকে হাত বাড়াব।’
এই বক্তব্যের পর পশ্চিমা বিশ্বে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইরান কি তার দীর্ঘদিনের পরমাণুনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখনো ইরান সরকারের পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। তারপরও বক্তব্যটির রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। মুসাভিফার্দ স্পষ্ট করেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরীণ এখতিয়ার। অর্থাৎ, তেহরানের ওপর পরমাণু শক্তি নিয়ে ক্রমাগত চাপ বাড়ানো হলে ইরান আরও কঠোর সামরিক অবস্থান নিতে পারে—এমন একটি বার্তাই তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেন। মুসাভিফার্দ বলেন, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই সংঘাতে এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তেহরান সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক চাপে পরিণত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থাও মার্কিন স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবারও পৃথক এক বক্তব্যে আরও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি, ইরানের নীতিগত শর্তগুলো পূরণ করা না হলে চলমান পরিস্থিতি ‘আক্রমণাত্মক যুদ্ধের পর্যায়ে’ চলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের অবস্থানে এখন দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান, অন্যদিকে চাপ বাড়লে সর্বাত্মক সামরিক প্রতিরোধের প্রস্তুতি। এর সঙ্গে পরমাণু অস্ত্রের সরাসরি ব্যবহার নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা যোগ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও জটিল ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

