মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। টানা দুই দিনের ঊর্ধ্বগতির পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগ এখন একটাই—মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের সময় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে ওঠে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে।
এর আগের দিন, সোমবারও বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির পর লেনদেন শুরু হতেই ব্রেন্ট তেলের দাম এক লাফে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। ২০২০ সালের মে মাসের পর একদিনে এত বড় মূল্যবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি। মঙ্গলবারের নতুন বৃদ্ধির ফলে ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ মূল্য।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি। যুদ্ধবিরতির সমঝোতা অকার্যকর ঘোষণা করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল আবারও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নৌ অবরোধ। ওয়াশিংটন আবারও ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের সামরিক উপস্থিতিও বেড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণমুখী পথে ওমানের আঞ্চলিক জলসীমায় আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এ ঘটনায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হন। এই হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যেসব দেশের নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে যুক্তরাষ্ট্র, সেই দেশগুলোর উচিত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয় বহন করা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনার ফলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তাঁদের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ না হলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় কিংবা এই জলপথে চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহাল এবং তার জবাবে ইরানের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি এখনো খোলা থাকলেও দুই পক্ষের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে, ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনাও থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াইজেসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে বন্দর আব্বাসে সাতটি এবং কিশ দ্বীপে আরও দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এদিকে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। ফলে লোহিত সাগর অঞ্চলও নতুন করে অস্থির হয়ে উঠছে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, যদি লোহিত সাগর ও হরমুজ—দুই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটেই নিরাপত্তা সংকট বাড়তে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমানে তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি উৎপাদন ঘাটতি নয়, বরং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির আশঙ্কাই বাজারকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে পারে।

