যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন তাদের অভিযানের সফলতার দাবি করছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন এই হামলার কঠোর সমালোচনা করে বলছে, এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। একই সময়ে ইসরায়েলও ইরানকে নতুন করে হামলা চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যেই ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কোনো ধরনের ফি আরোপের ধারণাকে তিনি সমর্থন করেন না। তবে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনায় থাকা রাশিয়াবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বিলে ইরান এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সামরিক হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তিনি দাবি করেন, অতীতেও ইরানকে দুর্বল করার বহু চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং এবারও দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে শান্তি প্রচেষ্টার জন্য বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকেও ইরান ইস্যুতে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়। চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি সুন লেই অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তার মতে, গাজা যুদ্ধ থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের উত্তেজনা—সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পেছনে ওয়াশিংটনের নীতির প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ পাল্টা অভিযোগ করেন, ইরান এবং চীনের কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র পৌঁছাতে সহায়তা করছে। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র বাকবিনিময় হয়।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের ওপর নতুন করে হামলা হলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেওয়া হবে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে ইসরায়েল বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালাতে প্রস্তুত।
সাম্প্রতিক হামলার ধারাবাহিকতায় ইরানের বিভিন্ন এলাকায় নতুন বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া গেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কেশম ও কিশ দ্বীপ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্দিমেশক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও হতাহত সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জর্ডান ও বাহরাইন দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। দুই দেশই জানিয়েছে, এসব ঘটনায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উত্তেজনাও যেভাবে বাড়ছে, তাতে সংকট দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত খুবই সীমিত বলে মনে করছেন তারা।

