অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সংঘাতের মধ্যে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিল তরুণ ফুটবলার ফাদি হামদাল্লাহ আল-নাসানের মৃত্যু। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই থেমে গেল তার স্বপ্নের পথচলা। ফিলিস্তিনের জাতীয় যুব ফুটবল দলের এই সদস্য ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত শনিবার (১৮ জুলাই) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার পরিবার, স্থানীয় কর্মকর্তারা এবং ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ জুলাই পশ্চিম তীরের আল-মুঘাইয়ির গ্রামে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সময় ইসরাইলি বাহিনীর ছোড়া গুলি ফাদির উরুতে লাগে। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে চিকিৎসকদের তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। নিবিড় চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ফাদি আল-নাসান ছিলেন ফিলিস্তিনের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলার। জাতীয় যুব দলের পাশাপাশি তিনি আল-মুঘাইয়ির ক্লাবের হয়েও নিয়মিত খেলতেন। খুব অল্প বয়সেই মাঠে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। পরিবার ও পরিচিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবলের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তিনি ছিলেন মনোযোগী এবং সবার কাছে ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন তরুণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ফাদির বাবা হামদাল্লাহ আল-নাসান জানান, হামলার সময় গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে নারীদের চিৎকার শুনে ফাদি ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। পরিবারের দাবি, মানুষের পাশে দাঁড়াতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তার বাবা বলেন, ছেলেটি সাহায্য করতে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার মা হানান আল-নাসান। তিনি বলেন, ফাদি একজন ভালো ছাত্র ছিল। ফুটবল ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা এবং ভবিষ্যতে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার বড় স্বপ্ন ছিল তার। পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
শনিবার রামাল্লার প্যালেস্টাইন মেডিকেল কমপ্লেক্স থেকে ফাদির মরদেহ নিজ গ্রাম আল-মুঘাইয়িরে নিয়ে যাওয়া হয়। কালো পোশাক পরিহিত অসংখ্য মানুষ শোক মিছিলে অংশ নেন। পরে স্বজন, প্রতিবেশী, সতীর্থ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়। পুরো এলাকাজুড়ে ছিল গভীর শোকের আবহ।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনের ক্রীড়াঙ্গনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৫৬৮ জন ফুটবল অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংস্থাটির মতে, চলমান সংঘাতের কারণে ক্রীড়াজগতও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড় তাদের স্বপ্ন পূরণের আগেই জীবন হারিয়েছেন।
ফাদির মৃত্যু পশ্চিম তীরের চলমান পরিস্থিতিকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরাইলের দখলে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে বিতর্ক ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরাইল সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে থাকে। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক, মানবিক এবং আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
ফাদি আল-নাসানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরও প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে জাতীয় দলের একজন ফুটবলারের জীবন এভাবে থেমে যাওয়া আবারও মনে করিয়ে দেয়, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। তার অসমাপ্ত স্বপ্ন এখন ফিলিস্তিনের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে।

