বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু দেশ রয়েছে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের সময় নীতি ও প্রয়োজনকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তুরস্ক এখন সেই দেশগুলোর অন্যতম। একদিকে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, কৃষ্ণসাগর ও এশিয়ার সংযোগস্থলে তুরস্কের অবস্থান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দেশটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ পশ্চিমের হাতে নেই।
চীনের দ্রুত উত্থান, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বেশি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অনেক নীতিতে পরিবর্তন যোগ হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সরকার থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান—সবাইকে এখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিরাপত্তা, সামরিক জোট ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা গেছে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ন্যাটো সম্মেলনে। সম্মেলনটি এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো ঘোষিত নীতির তুলনায় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজন অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে তুরস্কের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
তুরস্কের শক্তি শুধু সামরিক নয়, ভৌগোলিকও
তুরস্কের গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমেই দেশটির মানচিত্রের দিকে তাকাতে হয়। ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝামাঝি অবস্থান করা দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থলগুলোর একটি নিয়ন্ত্রণ করে। বসফরাস প্রণালির ওপর তুরস্কের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা কৃষ্ণসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই জলপথ রাশিয়ার প্রধান উষ্ণ-পানির সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। ফলে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তুরস্কের সিদ্ধান্ত সরাসরি রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ন্যাটোর স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে।
তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, গ্রিস, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার সঙ্গে। একই সঙ্গে দেশটি কৃষ্ণসাগরের উপকূল ভাগ করে নিয়েছে বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, রোমানিয়া, ইউক্রেন ও রাশিয়ার সঙ্গে। এই বিস্তৃত ভৌগোলিক যোগাযোগ তুরস্ককে একই সময়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ককেশাসের রাজনীতি এবং কৃষ্ণসাগরের সামরিক ভারসাম্যের অংশ করে তুলেছে।
প্রায় ৮৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী। পাশাপাশি দেশটি ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ তুরস্কের প্রয়োজনীয়তা শুধু সেনাবাহিনী কিংবা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং শিল্পপণ্য সরবরাহেও দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তুরস্ক এমন এক অংশীদার, যার সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়।
পশ্চিমমুখী যাত্রা থেকে সম্পর্কের অবনতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরো সময় নিরপেক্ষ থাকার পর তুরস্ক ন্যাটোতে যোগ দিয়ে দৃঢ়ভাবে পশ্চিমা জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে দেশটি বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বসূরি ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের সহযোগী সদস্য হয় এবং পূর্ণ সদস্যপদের আবেদনও করে।
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিচার ও উন্নয়ন দল ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির আলোচনা নতুন গতি পেয়েছিল। সে সময় অনেকের ধারণা ছিল, তুরস্ক ধীরে ধীরে ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে হতে প্রায় অচল হয়ে যায়। ২০১৭ সালের পর সদস্যপদ আলোচনা কার্যত থেমে পড়ে। এর পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনীহা যেমন ছিল, তেমনি এরদোয়ানের শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়ার অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিরোধী রাজনীতিক, সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকায় ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের দূরত্বও বেড়েছে। ফলে একসময় যে দেশকে সম্ভাব্য ইউরোপীয় অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে পশ্চিমা জোটের জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু অস্বস্তিকর মিত্রে পরিণত হয়েছে।
এরদোয়ানের শাসন ও পশ্চিমের অস্বস্তি
এরদোয়ানের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তুরস্কের সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান আগের অনেক মার্কিন নেতার তুলনায় ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। গণতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশ্যে চাপ দেওয়ার বদলে ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বকে তুলনামূলক বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন তুরস্কের কাছে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি আটকে দিয়েছিল। কারণ তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনেছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, একই দেশের হাতে এস-৪০০ এবং এফ-৩৫ থাকলে রাশিয়া এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। তুরস্কের কান যুদ্ধবিমান কর্মসূচির জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ইঞ্জিন বিক্রির পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এফ-৩৫ বিক্রির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তন শুধু অস্ত্র বিক্রির বিষয় নয়। এটি দেখায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কারণ আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক বেশি খারাপ হলে তুরস্ক রাশিয়া কিংবা চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।
একই সঙ্গে পশ্চিম ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক
রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ কেনার সিদ্ধান্ত তুরস্কের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় উদাহরণ। আঙ্কারা দেখিয়েছে, ন্যাটোর সদস্য হয়েও তারা পশ্চিমা জোটের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সময়েও এরদোয়ান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। একই সময়ে তুরস্ক ইউক্রেনকে চালকবিহীন যুদ্ধযান সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ দেশটি পুরোপুরি রাশিয়ার পক্ষে যায়নি, আবার পশ্চিমা অবস্থানও নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করেনি।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ নিয়েও এরদোয়ান কঠোর সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংঘাতে যোগ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করেছিল। এই অবস্থান আঙ্কারার কৌশলগত দ্বৈততার আরেকটি দিক তুলে ধরে।
তুরস্ক কখনো ন্যাটোর সদস্য হিসেবে পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ, আবার কখনো পশ্চিমের সমালোচক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে নিজেকে উপস্থাপন করে। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে চলাচল করে এরদোয়ান সরকার নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে এই নীতির ঝুঁকিও রয়েছে। সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কৌশল স্বল্পমেয়াদে তুরস্ককে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশটির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। পশ্চিম তুরস্ককে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য মনে করে না, আবার রাশিয়াও জানে যে আঙ্কারা ন্যাটো ছাড়ছে না।
অর্থনীতিতে সাফল্য ও অস্থিরতা পাশাপাশি
দুই দশক আগে তুরস্ককে বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগের আর্থিক সংকটের পর সাবেক অর্থমন্ত্রী কামাল দারবিশের উদ্যোগে চালু হওয়া ব্যাপক সংস্কার দেশটির অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তি দিয়েছিল।
এরদোয়ানের শাসনের প্রথম দিকে তুরস্ক উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বিমানবন্দর, শিল্প উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা খাতের সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে না, রপ্তানিরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি সব সময় স্থিতিশীল ছিল না। দ্রুত উত্থান ও আকস্মিক পতনের পুনরাবৃত্ত চক্র, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনীতিকে বারবার চাপে ফেলেছে।
এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছেন যে সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমার বদলে বাড়ে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণার বিপরীত এই অবস্থান তুরস্কের মুদ্রানীতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২২ সালে তুরস্কের মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। বড় ধরনের স্থিতিশীলতা কর্মসূচির পর মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও অর্থনীতির ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বিনিময় হারের অস্থিরতা, রপ্তানি দুর্বল হওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এখনো বড় সমস্যা।
এখানে তুরস্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক দেখা যায়। যখন নীতিনির্ধারণ ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কমে যায়, তখন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের আস্থা দুর্বল হতে পারে। ফলে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের দ্বিমুখী প্রভাব
ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ তুরস্কের অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অঞ্চল থেকে কিছু ব্যবসা তুরস্কে সরে এসেছে। সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বেড়েছে এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং পণ্যের দামের ওঠানামা বেড়েছে। তুরস্কের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের ভেতরে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্য, শিল্পপণ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে।
তাই আঞ্চলিক সংঘাত তুরস্ককে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ দিলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানি থেকে আয় বাড়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি একাই মুদ্রার অস্থিরতা কিংবা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সমস্যা সমাধান করতে পারে না।
ন্যাটো সম্মেলনে বদলে যাওয়া ভাষা
আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ন্যাটো সম্মেলনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য পশ্চিমা মিত্র তুরস্কের বিষয়ে সতর্ক ছিল। এরদোয়ানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানবিরোধী পদক্ষেপ, পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং প্রশ্নবিদ্ধ অর্থনৈতিক নীতির কারণে আঙ্কারাকে নিয়ে তাদের অস্বস্তি ছিল প্রকাশ্য।
কিন্তু তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি ধীরে ধীরে বেশি প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। সম্মেলনে ট্রাম্প প্রকাশ্যে এরদোয়ানের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা থেকে বিরত ছিলেন।
এই নীরবতা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এটি পশ্চিমের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের সংকেত। নিরাপত্তা পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ততই তুরস্কের গণতান্ত্রিক ঘাটতি নিয়ে পশ্চিমের প্রকাশ্য অবস্থান নরম হচ্ছে।
তবে এই নীতির মূল্যও রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি কেবল কৌশলগত সুবিধার জন্য গণতান্ত্রিক অবক্ষয় উপেক্ষা করে, তাহলে তাদের নিজস্ব ঘোষিত মূল্যবোধের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
পশ্চিমের সামনে দুই দিকেই ঝুঁকি
তুরস্ককে নিয়ে পশ্চিমের প্রধান সমস্যা হলো, কঠোরতা এবং নমনীয়তা—দুই পথেই বড় ঝুঁকি রয়েছে।
তুরস্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হলে দেশটি রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। এতে কৃষ্ণসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে পশ্চিমের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে এরদোয়ান সরকারের ওপর খুব কম চাপ দেওয়া হলে তুরস্কে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে শুধু তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, পশ্চিমের নৈতিক অবস্থানও দুর্বল হবে। যারা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কথা বলে, তারা প্রয়োজনের সময় এসব নীতি উপেক্ষা করলে তাদের বক্তব্য কম বিশ্বাসযোগ্য হয়ে পড়ে।
পশ্চিমের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে তুরস্ককে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ধরে রাখা, একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিও বজায় রাখা। শুধু প্রশংসা কিংবা শুধু চাপ—কোনোটিই স্থায়ী সমাধান নয়।
তুরস্কও এই সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল
তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে পশ্চিমের মতো তুরস্কেরও এই সম্পর্ক প্রয়োজন। ইউরোপ তুরস্কের বড় বাজার। পশ্চিমা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তুরস্ককে বিকল্প সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু তা ইউরোপীয় ও মার্কিন বাজারের পূর্ণ বিকল্প নয়। একইভাবে ন্যাটোর সদস্যপদ তুরস্ককে যে নিরাপত্তা সুবিধা দেয়, তা অন্য কোনো জোট থেকে সহজে পাওয়া সম্ভব নয়।
ফলে আঙ্কারার দর-কষাকষির ক্ষমতা শক্তিশালী হলেও তা সীমাহীন নয়। তুরস্ক পশ্চিমকে প্রয়োজন করে, আবার পশ্চিমও তুরস্ককে বাদ দিয়ে নিজের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাতে পারে না। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
সামনে কোন পথে এগোবে সম্পর্ক
তুরস্ককে ঘিরে পশ্চিমের বর্তমান দ্বিধা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং রাশিয়া, ইউক্রেন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তুরস্কের গুরুত্ব তত বাড়তে পারে।
কিন্তু শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে না। স্থায়ী সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
তুরস্ক যদি নিজের কৌশলগত অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে রূপ দিতে চায়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি। একইভাবে পশ্চিমকেও এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং গণতান্ত্রিক নীতির মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য থাকবে।
তুরস্ককে অতিরিক্ত দূরে ঠেলে দেওয়া যেমন পশ্চিমের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে, তেমনি সব ধরনের রাজনৈতিক অবক্ষয় নীরবে মেনে নেওয়াও বিপজ্জনক। এই দুই সীমার মাঝখানে কার্যকর পথ খুঁজে পাওয়াই এখন ন্যাটো ও ইউরোপীয় নেতাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তুরস্ক তাই পশ্চিমের জন্য শুধু একটি মিত্রদেশ নয়। দেশটি একই সঙ্গে একটি কৌশলগত প্রয়োজন, রাজনৈতিক অস্বস্তি এবং নৈতিক পরীক্ষার নাম। ভবিষ্যতে পশ্চিম কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই তিন বাস্তবতার সমন্বয় করতে পারে, তার ওপর শুধু তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক নয়—পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে নির্ভর করবে।

