যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার আসলে মার্কিন নাগরিকদের জন্য তেল ও পেট্রলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা।
গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স স্পষ্টভাবে বলেন, প্রথম লক্ষ্য আমেরিকানদের জন্য জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর এরপরই আসে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়টি।
ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি লক্ষ্যই সফলভাবে অর্জন করছে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী। তবে সঙ্গে সঙ্গেই সতর্ক করেন, ইরানের আচরণ পূর্বানুমান করা কঠিন এবং অতীতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি—ফলে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াবে, ইরানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে এমন একটি পরিস্থিতি নিশ্চিত হবে, যাতে মার্কিন জনগণের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম স্থিতিশীল থাকে।
উল্লেখ্য, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর ইরান পাল্টা এই প্রণালি অবরোধ করে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর জবাবে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রও ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ভ্যান্সের এই সাক্ষাৎকারের সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ও প্রতিরক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হতে পারে, যার সঙ্গে থাকবে হরমুজ প্রণালিতে অব্যাহত নৌ-অবরোধ, যাতে ইরানের বন্দরে পণ্য প্রবেশ বা বের হওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিরক্ষামন্ত্রীও জানান, প্রয়োজনে জাহাজ পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে এই অবরোধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তবে এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতির একটি মানবিক দিকও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ইরান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী গত নভেম্বর থেকে মোতায়েন রয়েছে এবং জানুয়ারিতে তা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রণতরীটি টানা ২০০ দিনেরও বেশি সময় কোনো বন্দরে ভেড়েনি। সামরিক বাহিনী-সংক্রান্ত একটি সংবাদমাধ্যম কয়েকজন নাবিকের পরিবারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি এই মোতায়েনের মানসিক চাপে কয়েকজন নাবিক সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন।
তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই প্রতিবেদনগুলোকে অতিরঞ্জিত বলে প্রত্যাখ্যান করে জানান, প্রতিটি জাহাজ ও নাবিককে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই এই নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, বর্তমান রণতরীর পরিবর্তে আরেকটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে, যদিও কর্মকর্তারা বলছেন এটি স্বাভাবিক রোটেশনেরই অংশ।
সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অবরোধ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যের চাপের মধ্যে ভ্যান্সের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দমনের পাশাপাশি জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণও বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধনীতির অন্যতম মূল অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

