সৌদি আরব ধর্মীয় পর্যটনকে আরও গতিশীল করতে ওমরাহ ভিসা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওমরাহ ভিসার মেয়াদ এখন থেকে এক বছর বা ৩৬৫ দিন হবে। এই সময়ের মধ্যে ভিসাধারীরা একাধিকবার সৌদি আরবে প্রবেশ করতে পারবেন এবং প্রতিবার সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত অবস্থানের সুযোগ পাবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ দেশটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা সৌদি ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সোমবার সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা জানায়, নতুন ভিসা নীতির মূল লক্ষ্য হলো ধর্মীয় পর্যটনকে আরও সহজ, আধুনিক ও দর্শনার্থীবান্ধব করা। বিশেষ করে যারা বছরে একাধিকবার ওমরাহ পালনের ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের সুবিধা এনে দেবে। আগে প্রতিবার নতুন ভিসার জন্য আবেদন করার প্রয়োজন হতো, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় একই ভিসা ব্যবহার করে একাধিকবার সৌদি সফরের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এই সুবিধার সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবার সৌদি আরবে প্রবেশের আগে ভিসাধারীদের সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নুসুক থেকে অনুমোদিত প্যাকেজ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের আগে একই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওমরাহ পালনের অনুমতিপত্র সংগ্রহ করাও বাধ্যতামূলক। কর্তৃপক্ষের মতে, এই পদ্ধতি দর্শনার্থীদের যাত্রা আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে সহায়তা করবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হজ মৌসুমে এই ভিসা সাময়িকভাবে কার্যকর থাকবে না। আরবি মাস জিলকদের ১ তারিখ থেকে পরবর্তী জিলহজের ১৩ তারিখ পর্যন্ত ওমরাহ ভিসা ব্যবহার করা যাবে না। হজের সময় অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং হজযাত্রীদের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করতেই এই বিধান বহাল রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটন খাতেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। দেশটি চায় তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে। সেই লক্ষ্যেই ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল সেবা বাড়ানো এবং বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য আরও সুবিধাজনক পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এক বছরের বহুমেয়াদি ওমরাহ ভিসা সেই বৃহৎ পরিকল্পনারই অংশ।
এদিকে সৌদি সরকার বিদেশি গৃহকর্মীদের আবাসিক অনুমতিপত্র বা আকামা নবায়নের নিয়মেও বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে নিয়োগকর্তারা ন্যূনতম তিন মাস মেয়াদে আকামা ইস্যু বা নবায়ন করতে পারবেন। প্রয়োজনে ৩, ৬, ৯, ১২, ১৫, ১৮, ২১ অথবা ২৪ মাস—এই মেয়াদগুলোর যেকোনো একটি নির্বাচন করা যাবে।
সরকার জানিয়েছে, এই সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তর, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিয়োগ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে আকামা ইস্যু ও নবায়নের সুযোগ দেওয়া হবে। ফলে কাগজপত্রের ঝামেলা কমবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিন মাস বা এর গুণিতক মেয়াদের আকামা নবায়নের ক্ষেত্রে ফি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে নিয়োগকর্তাদের একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। প্রয়োজন ও আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী তারা নির্ধারিত মেয়াদ বেছে নিতে পারবেন।
এর আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহকর্মীদের আকামা এক বা দুই বছরের জন্য একবারেই নবায়ন করতে হতো। এতে অনেক নিয়োগকর্তার ওপর এককালীন আর্থিক চাপ তৈরি হতো। নতুন নীতির মাধ্যমে সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ওমরাহ ভিসা সহজীকরণ এবং আকামা ব্যবস্থায় নমনীয়তা—দুটি সিদ্ধান্তই সৌদি আরবের প্রশাসনিক আধুনিকায়ন ও সেবা উন্নয়নের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ। একদিকে ধর্মীয় পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি কর্মীদের ব্যবস্থাপনাকেও আরও বাস্তবসম্মত ও সহজ করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে দেশটির পর্যটন খাত, সেবাখাত এবং শ্রমবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

