সামরিক বিজয় সব সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না। কখনো কখনো একটি ফোনকল, একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী এবং সঠিক সময়ে নেওয়া রাজনৈতিক ঝুঁকি এমন ফল এনে দেয়, যা শক্তিশালী সেনাবাহিনী কিংবা দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও দিতে পারে না। ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাতে পাকিস্তানের ভূমিকা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
আসফানদিয়ার মীরের বিশ্লেষণে পাকিস্তানের এই ভূমিকাকে শুধু একটি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ইসলামাবাদের সম্ভাব্য উত্থানের সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, অর্থনীতি বা প্রচলিত পরাশক্তির মর্যাদায় পিছিয়ে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একযোগে যোগাযোগ রাখার ক্ষমতা পাকিস্তানকে নতুন ধরনের কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত করছে।
বিপর্যয়ের মুখে যে ফোনকল যুদ্ধ থামিয়ে দিল
৭ এপ্রিল পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ইরান সরকারকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হয়ে আসছিল। দাবি না মানলে ইরানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও সামনে ছিল।
ঠিক সেই সংকটপূর্ণ সময়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সক্রিয় হন। তিনি ট্রাম্প এবং ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্ব—উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতকে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে না দেওয়া, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রকাশ্যে আসিম মুনির ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে ধন্যবাদ জানান। এর কয়েক দিন পর ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ।
এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু যুদ্ধ থামানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে ছিল, যেখানে দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনা করতেও আগ্রহী ছিল না। পাকিস্তান সেই বন্ধ দরজার মাঝখানে একটি গ্রহণযোগ্য প্রবেশপথ তৈরি করে দেয়।
পাকিস্তান কি সত্যিই যুদ্ধ জিতেছে?
“পাকিস্তান যুদ্ধ জিতেছে”—এ বক্তব্যকে সামরিক অর্থে বিবেচনা করলে ভুল হবে। পাকিস্তানি বাহিনী ইরানে প্রবেশ করেনি, কোনো ভূখণ্ড দখল করেনি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কাউকে পরাজিতও করেনি। কিন্তু কূটনৈতিক অর্থে ইসলামাবাদ এমন একটি সাফল্য অর্জন করেছে, যা অনেক বড় রাষ্ট্রও করতে পারেনি।
সংঘাতের সময়ে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো কার্যকর সমাধানের পথ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে সীমিত অর্থনীতি, অস্থির রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই প্রতিপক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এখানেই পাকিস্তানের আসল জয়। দেশটি নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বড় একটি কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে। সংঘাতের ফলাফল নির্ধারণে সরাসরি যুদ্ধ না করেও যে প্রভাব বিস্তার করা যায়, ইসলামাবাদ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে।
পরাশক্তিগুলো কেন ব্যর্থ হলো
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতিনীতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। জোট, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে উদারনৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বদলে তিনি ব্যক্তিনির্ভর ও লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে সমস্যাটি শুধু ট্রাম্পের কৌশলে নয়। তার আগেই প্রচলিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সামরিক সহায়তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জোটের চাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের আহ্বান—এসব ব্যবস্থা সাম্প্রতিক বড় সংঘাতগুলোর সমাধান দিতে পারেনি।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে দেওয়া বিপুল সামরিক সহায়তাও যুদ্ধ থামাতে পারেনি। সংঘাত তখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। গাজায় প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। একইভাবে পশ্চিমা নৌজোট লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি।
ইরান সংকটেও একই চিত্র দেখা যায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়লেও উদ্বেগ প্রকাশের বাইরে তাদের বড় কোনো ভূমিকা ছিল না। ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে মধ্যস্থতা করা চীনও এবার মূল সংঘাত থেকে দূরে থাকে। বহু পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নীতি প্রচার করা ভারতও মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেয়নি। এই শূন্য জায়গাতেই পাকিস্তান প্রবেশ করে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার দ্বিমুখী সম্পর্ক
পাকিস্তানের অর্থনীতি বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সমপর্যায়ের নয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও দেশটির বড় কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু ইসলামাবাদের এমন কিছু সম্পর্ক রয়েছে, যা অনেক পরাশক্তির নেই।
পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। একই সঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের সামরিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আবার প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে দেশটির ভৌগোলিক, ধর্মীয় এবং নিরাপত্তাভিত্তিক সম্পর্কও উপেক্ষা করার মতো নয়।
সাধারণ সময়ে এই বহুমুখী অবস্থানকে দ্বিধাগ্রস্ত পররাষ্ট্রনীতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সংকটের সময় এটিই পাকিস্তানের সবচেয়ে কার্যকর সম্পদে পরিণত হয়েছে। তেহরান এমন একজন মধ্যস্থতাকারী চেয়েছিল, যাকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলে মনে হবে না। ওয়াশিংটনও এমন একটি পক্ষ খুঁজছিল, যার কথা ইরান অন্তত শুনতে রাজি হবে। পাকিস্তান দুই পক্ষের কাছেই সেই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
একটি দেশ যখন কেবল একটি জোটের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে, তখন প্রতিপক্ষ তাকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করতে চায় না। পাকিস্তানের সুবিধা হলো, দেশটি কোনো একটি শিবিরের সঙ্গে পুরোপুরি নিজেকে আটকে রাখেনি। এই কৌশল তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতু তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে।
শুধু সম্পর্ক নয়, প্রয়োজন ছিল বিশ্বাসযোগ্য চাপেরও
মধ্যস্থতার জন্য ভালো সম্পর্ক যথেষ্ট নয়। আলোচনায় থাকা পক্ষগুলোকে বুঝতে হয়, মধ্যস্থতাকারীর কথাকে উপেক্ষা করলে তার বাস্তব পরিণতি হতে পারে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই চাপ সৃষ্টির সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে ইরানের হামলা আরও বিস্তৃত হলে পাকিস্তান সৌদি আরবের পক্ষে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারত। পাকিস্তান যুদ্ধে প্রবেশ করলে অন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ওপরও অবস্থান নেওয়ার চাপ বাড়ত।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মুখে পড়ত না; মুসলিম বিশ্বের একটি অংশ থেকেও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত। তেহরানের জন্য এই সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফলে পাকিস্তানের আহ্বানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সহজ ছিল না।
অর্থাৎ পাকিস্তান একদিকে সম্ভাব্য সামরিক অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিতে পেরেছে, অন্যদিকে আলোচনার নিরাপদ পথও খুলে রেখেছে। চাপ ও আশ্বাসের এই সমন্বয়ই কার্যকর মধ্যস্থতার প্রধান শর্তগুলোর একটি।
আসিম মুনিরের ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি
প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাফল্যে নেতৃত্বের ভূমিকাও বড়। ব্যর্থ মধ্যস্থতার চেষ্টা একজন নেতার ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে বড় রাষ্ট্রগুলোর নেতারা অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ঝুঁকি নিতে চান না।
আসিম মুনির সেই ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি মনে করেছিলেন, প্রচণ্ড হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারেন। সেই ধারণার ভিত্তিতেই তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেন এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান।
এখানে ট্রাম্পের ব্যক্তিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতিও পাকিস্তানের জন্য সহায়ক হয়। প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোর বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে আসিম মুনির সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
তবে এই পদ্ধতির ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা টেকসই নয়। নেতৃত্ব পরিবর্তিত হলে সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই পাকিস্তানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যক্তিনির্ভর সাফল্যকে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সক্ষমতায় রূপ দেওয়া।
সংকটাপন্ন রাষ্ট্র থেকে মধ্যস্থতাকারী শক্তি
গত দুই দশকের অধিকাংশ সময় পাকিস্তান এমন ভূমিকা পালনের অবস্থায় ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।
২০২২ সালে আসিম মুনির সেনাপ্রধান হওয়ার সময় পাকিস্তান গুরুতর সংকটে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থির, অর্থনীতি খেলাপির কাছাকাছি এবং আফগানিস্তানের নতুন তালেবান সরকারের সমর্থন পাওয়া বিদ্রোহের বিস্তার—সব মিলিয়ে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মোড় তৈরি করে। প্রতিবেদনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৃহত্তর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আসিম মুনিরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক উষ্ণ হয়।
এর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাকিস্তানের আঞ্চলিক গুরুত্ব বাড়ায়। এই বহুমুখী প্রস্তুতি ইরান সংকটের সময় ইসলামাবাদকে দ্রুত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে সহায়তা করে।
শুধু পাকিস্তান নয়, নতুন ধরনের শক্তির উত্থান
পাকিস্তানের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। বর্তমান বিশ্বে এমন কয়েকটি রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যারা প্রচলিত পরাশক্তি নয়; কিন্তু পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে একযোগে যোগাযোগ রাখে।
কাতারে হামাসের রাজনৈতিক দপ্তর রয়েছে। একই দেশে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটিও অবস্থিত। এই বিপরীতধর্মী সম্পর্ক কাতারকে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ে ভূমিকা রাখার সুযোগ দিয়েছে।
মিসর রাফাহ সীমান্তপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গাজায় সহায়তা প্রবেশ এবং শরণার্থীদের বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ নিজের হাতে রেখেছে। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশটি উভয় পক্ষের ওপর সমঝোতার চাপ সৃষ্টি করেছে।
তুরস্ক একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, অন্যদিকে হামাসের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখে। একইভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলার ক্ষমতার কারণে কৃষ্ণসাগরীয় শস্যচুক্তির আলোচনায় দেশটি ভূমিকা রেখেছিল। ওই চুক্তি বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের আশঙ্কা কমাতে সহায়তা করে। সৌদি আরব ও ওমানও নীরব আলোচনার মাধ্যমে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা কমাতে ভূমিকা রাখে।
এই রাষ্ট্রগুলোর শক্তির উৎস শুধু অস্ত্র বা অর্থ নয়। তাদের প্রধান সম্পদ হলো যোগাযোগের উন্মুক্ত পথ। তারা এমন পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলতে পারে, যারা পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি বসতে রাজি নয়।
বিশ্বরাজনীতির নিয়ম কি বদলে যাচ্ছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ধরে একটি দেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব নির্ধারণে কয়েকটি বিষয়কে প্রধান মনে করা হতো—বিশাল অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, স্থায়ী জোট, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের গ্রহণযোগ্যতা।
পাকিস্তান কখনোই এসব মানদণ্ডের সবগুলো পূরণ করেনি। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও অর্থনীতি সীমিত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানকে অনেক সময় সংঘাত সমাধানকারীর চেয়ে আঞ্চলিক অস্থিরতার অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে আগের মানদণ্ডগুলো আর সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ বড় বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হয়, তখন মাঝারি শক্তির দেশগুলো শূন্যস্থান পূরণ করছে। তারা জিম্মি মুক্তি, বন্দি বিনিময়, বাণিজ্যপথ চালু, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং গোপন আলোচনার ব্যবস্থা করছে।
এই পরিবর্তনের ফলে এমন রাষ্ট্রের মূল্য বাড়ছে, যাদের অবস্থান পুরোপুরি একপক্ষীয় নয়। আগে যে বহুমুখী সম্পর্ককে দুর্বলতা বা অস্পষ্টতা মনে করা হতো, এখন সেটিই কূটনৈতিক সুবিধায় পরিণত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানের বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরে আনুষ্ঠানিক মিত্র ও অংশীদারদের ঘিরে সাজানো। উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য, এশিয়ার চুক্তিভিত্তিক অংশীদার এবং কয়েকটি আঞ্চলিক মিত্রকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো পরিচালনা করেছে।
স্নায়ুযুদ্ধ এবং এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সময় এই কৌশল কার্যকর ছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাতগুলো সহজে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ খাদ্য ও জ্বালানির বাজারে প্রভাব ফেলছে। গাজার সংঘাত লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথকে অস্থিতিশীল করছে। ইরান সংকট হরমুজ প্রণালি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু আনুষ্ঠানিক মিত্রদের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে এমন রাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হবে, যারা তার মূল্যবোধ বা সব কৌশলগত লক্ষ্য ভাগ করে না; কিন্তু প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটনে একটি শক্তিশালী ধারণা ছিল যে চীনকে মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে হলে পাকিস্তানকে দূরে রাখতে হবে। ট্রাম্প সেই ধারণা পুরোপুরি অনুসরণ করেননি। তিনি ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্ব দেন। ইরান সংকটের সময় এই ব্যতিক্রমী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যকর প্রমাণিত হয়।
পাকিস্তানের সামনে সুযোগের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও রয়েছে
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা সফল হলেও যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ভেঙে গেলে ইসলামাবাদের প্রভাবও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক রাখা অত্যন্ত কঠিন ভারসাম্যের বিষয়।
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে নতুন উত্তেজনা দেখা দিলে পাকিস্তানকে অবস্থান বেছে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। একইভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হলে ইসলামাবাদের বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হবে।
অভ্যন্তরীণ সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট এবং বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের কূটনৈতিক উত্থান কতটা রাষ্ট্রীয় এবং কতটা আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত সম্পর্কনির্ভর। স্থায়ী প্রভাব গড়ে তুলতে হলে ইসলামাবাদকে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ আলোচক এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নীতি তৈরি করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ
ইরান সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণে নিজেকে অঞ্চলের প্রধান কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এই সংকটে নয়াদিল্লির অনুপস্থিতি এবং ইসলামাবাদের সক্রিয়তা দুই দেশের ভিন্ন কৌশলকে সামনে এনেছে।
ভারতের শক্তি মূলত অর্থনীতি, বাজার, প্রযুক্তি এবং বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে। পাকিস্তানের নতুন সুবিধা তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তা যোগাযোগ, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষমতা থেকে।
এটি ভারতের সামগ্রিক শক্তিকে অতিক্রম করার প্রমাণ নয়। তবে পাকিস্তান দেখিয়েছে, সীমিত সম্পদ নিয়েও একটি রাষ্ট্র নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রতিযোগীর তুলনায় বেশি প্রভাবশালী হতে পারে। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি শুধু অর্থনৈতিক আকার দিয়ে নির্ধারিত নাও হতে পারে; যোগাযোগের পরিধি এবং সংকট ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের জয় কোথায়
ইরান সংকটে পাকিস্তানের জয় কোনো ভূখণ্ড, অস্ত্র বা সামরিক পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি মূলত গ্রহণযোগ্যতার জয়। ইসলামাবাদ এমন দুটি পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পেরেছে, যারা সরাসরি একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে অনিচ্ছুক ছিল।
এই সাফল্য দেখিয়েছে, বর্তমান অস্থির বিশ্বে প্রভাবশালী হওয়ার জন্য সব সময় পরাশক্তি হওয়া প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো সবচেয়ে মূল্যবান রাষ্ট্র সেই দেশ, যে শত্রুপক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে পারে।
ইউরোপের নিরাপত্তা এখনো অনিশ্চিত। লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ অথচ ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে রয়ে গেছে। ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতিও অস্থির থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোকে শুধু প্রচলিত বন্ধু ও মিত্রের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তাদের এমন মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রেরও প্রয়োজন হবে, যারা পরিচিত বন্ধু–শত্রুর বিভাজনের বাইরে অবস্থান করে।
পাকিস্তান এখন সেই নতুন শ্রেণির রাষ্ট্রগুলোর একটি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে একটি সফল মধ্যস্থতাকে স্থায়ী বিশ্বপ্রভাবে রূপ দিতে হলে দেশটিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি—তিন ক্ষেত্রেই উন্নতি করতে হবে।
যুদ্ধ থামানোর একটি ফোনকল পাকিস্তানের সামনে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামাবাদ সেই দরজা দিয়ে কত দূর এগোতে পারবে।

