ইরানের মধ্যাঞ্চলের একটি পাহাড়ি এলাকার নাম এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে। নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত রহস্যময় ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে’ খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ওই এলাকায় ‘খুব সম্ভবত শিগগিরই’ হামলা চালানো হবে এবং ইরান তা ঠেকাতে পারবে না। তাঁর বক্তব্যের পর বুধবার ভোরে তেহরান সতর্ক করে জানায়, ইরানের কোনো পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে সেটিকে চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ট্রাম্পের হুমকির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পিকঅ্যাক্স পাহাড় আসলে কী? সেখানে কি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও উন্নত সেন্ট্রিফিউজ রাখা হয়েছে? আর পাহাড়ের অন্তত ১০০ মিটার নিচে নির্মিত এই স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আদৌ কার্যকর হামলা চালাতে পারবে কি না?
স্থাপনাটি ঘিরে নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে দাবি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও উপগ্রহ চিত্রনির্ভর অনুমানই বেশি। ফলে পিকঅ্যাক্স পাহাড় এখন শুধু একটি সম্ভাব্য পরমাণু স্থাপনা নয়; এটি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কোথায় এই পিকঅ্যাক্স পাহাড়?
পিকঅ্যাক্স পাহাড় ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা। এটি নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে প্রায় এক মাইল দক্ষিণে। নাতাঞ্জে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং পাহাড়ের গভীরে নির্মাণের কারণে পিকঅ্যাক্স স্থাপনাটি আকাশপথে হামলা কিংবা সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জন্য অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, স্থাপনাটি ‘কুহ-ই কলাং গাজ লা’ নামের একটি বড় পাহাড়ের অন্তত ১০০ মিটার বা ৩২৮ ফুট নিচে নির্মাণ করা হয়েছে। ‘কলাং’ শব্দের অর্থ খননকাজে ব্যবহৃত পিকঅ্যাক্স বা গাঁইতি। সেখান থেকেই এলাকাটি পিকঅ্যাক্স পাহাড় নামে পরিচিতি পেয়েছে।
২০২৬ সালের ৩০ জুন ধারণ করা উপগ্রহ চিত্রে পাহাড়টির কাছে কয়েকটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ দেখা যায়। তবে ভেতরে ঠিক কী ধরনের অবকাঠামো রয়েছে, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করার মতো কোনো নকশা বা সরাসরি ছবি নেই।
নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের ভূগর্ভস্থ স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। সে সময় ইরান জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে জানিয়েছিল, ভবিষ্যতে পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজনের জন্য সেখানে একটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
সেন্ট্রিফিউজ হলো এমন এক ধরনের দ্রুত ঘূর্ণনশীল যন্ত্র, যার সাহায্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়। ইউরেনিয়াম কম মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ইরান প্রকাশ্যে বলেছে, পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজনের কাজ হওয়ার কথা। তবে এর কার্যক্রম এখনো সেই ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে কি না, তা নিয়ে পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের সন্দেহ রয়েছে।
স্থাপনাটির কোনো প্রকাশ্য নকশা না থাকায় বিশেষজ্ঞরা উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে এর আকার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছেন।
উপগ্রহ চিত্রে কী দেখা গেছে?
সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সেখানে একাধিক সুড়ঙ্গসংবলিত স্থাপনা, বিস্তৃত নিরাপত্তা এলাকা এবং কংক্রিট দিয়ে শক্ত করা প্রবেশপথের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন।
প্রবেশপথগুলো এমনভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। পাহাড়ের গভীরতা এবং শক্তিশালী কংক্রিটের ব্যবহার থেকে ধারণা করা হচ্ছে, স্থাপনাটিকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হুমকি বিবেচনায় রেখেই নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের স্থাপনাটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি বলে ধারণা করা হয়। সেখানে নির্মাণকাজ চলমান থাকার বিভিন্ন লক্ষণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের অন্যান্য পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পিকঅ্যাক্স এলাকায় তৎপরতা বেড়েছে বলে উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।
নাতাঞ্জের যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছিল, তা পিকঅ্যাক্স পাহাড় থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। ফলে নাতাঞ্জের কিছু কার্যক্রম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও পিকঅ্যাক্স ব্যবহৃত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সেখানে কী ধরনের কাজ হতে পারে?
কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে তৎপরতা বাড়ার অন্তত তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
প্রথমত, ইরান সেখানে সেন্ট্রিফিউজ তৈরি বা সংযোজন করতে পারে, যা দেশটি আগেই জাতিসংঘকে জানিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর মতো ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনার কিছু কার্যক্রম পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে স্থানান্তর করা হতে পারে।
তৃতীয়ত, পাহাড়ের গভীরে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করা হতে পারে। এই সম্ভাবনাটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কারণ গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র চালু হলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পক্ষে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটিই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে অকাট্য প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে পিকঅ্যাক্স পাহাড় নিয়ে সামরিক পরিকল্পনা করা হলে তা অনেকাংশে গোয়েন্দা তথ্য ও অনুমানের ওপর নির্ভর করবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কি সেখানে নেওয়া হয়েছে?
ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ধারণা, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার পর তেহরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ এবং উন্নত সেন্ট্রিফিউজ পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে সরিয়ে নিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ইসরায়েলি সূত্র এমন দাবি করেছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা—নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোতে হামলা চালায়। হামলায় ইরানের পরমাণু গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শীর্ষ বিজ্ঞানীও নিহত হন।
যুদ্ধের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এতে যোগ দেয় এবং একই তিনটি স্থাপনায় আরও শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে হামলা চালায়। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অক্ষত থাকতে পারে। এর অর্থ, হামলার পরও ইরানের হাতে পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠনের কিছু প্রযুক্তি, উপকরণ ও সক্ষমতা রয়ে গেছে।
প্রায় ১ হাজার পাউন্ড ইউরেনিয়াম নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি যৌথ লক্ষ্য হলো, ইরানের কাছে থাকা প্রায় ১ হাজার পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা, ধ্বংস করা অথবা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা।
এই মজুতের অবস্থান পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরান যদি ওই ইউরেনিয়াম নিরাপদ ভূগর্ভস্থ স্থানে সরিয়ে থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতে দ্রুত পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আগের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইরান প্রায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সুরক্ষিত রাখতে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দেওয়া এবং প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপও রয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাইরে থেকে স্থাপনাটিতে প্রবেশ করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি সামরিক অভিযানের পরও ভেতরে কী অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ট্রাম্পও নিশ্চিত নন
মঙ্গলবার ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইরান কি তার উন্নত সেন্ট্রিফিউজ পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে সরিয়ে নিয়েছে?
জবাবে তিনি ইসরায়েলি প্রতিবেদনের গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নথিতে এমন তথ্য নিশ্চিতভাবে নেই।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে ট্রাম্প পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে খুব শিগগির হামলার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে সেখানে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই বলেও স্বীকার করছেন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, সম্ভাব্য হামলার উদ্দেশ্য কি নিশ্চিত কোনো পরমাণু মজুত ধ্বংস করা, নাকি ইরানকে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পরমাণু কার্যক্রম চালানো থেকে বিরত রাখার জন্য আগাম আঘাত হানা?
এ ধরনের আগাম হামলার ক্ষেত্রে ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ঝুঁকি থাকে। লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য অসম্পূর্ণ হলে হামলার সামরিক ফল সীমিত হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ও মানবিক পরিণতি অনেক বড় হতে পারে।
ইরান কী বলছে?
জুলাইয়ের শুরুতে তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র দাবি করেছিল, পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে পরমাণু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগ মিথ্যা।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং এর উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন।
তেহরান আরও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। ইরানের যুক্তি হলো, দেশীয় বিদ্যুৎ চাহিদা পরমাণু শক্তির মাধ্যমে পূরণ করা গেলে তেল ও গ্যাসের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। এতে রপ্তানির জন্য আরও বেশি তেল সংরক্ষণ করা যাবে।
তবে ইরানের এই ব্যাখ্যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশের সন্দেহ দূর করতে পারেনি। বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, পরিদর্শকদের প্রবেশে বাধা এবং কিছু স্থাপনার তথ্য গোপন রাখার অভিযোগের কারণে অবিশ্বাস বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি স্থাপনাটি ধ্বংস করতে পারবে?
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে কার্যকর হামলা চালানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়া স্ট্রিকার মনে করেন, ইরান যাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে, সে জন্য পিকঅ্যাক্স পাহাড়কে অকার্যকর করা প্রয়োজন।
তাঁর আশঙ্কা, সেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশ হিসেবে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ রাখা থাকতে পারে। এগুলো অক্ষত থাকলে ইরান ভবিষ্যতে তুলনামূলক দ্রুত নিজের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারবে।
তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থাপনাটির অবস্থান এত গভীরে যে বিমান হামলার মাধ্যমে এর মূল অংশ পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ হলেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে
পাহাড়ের নিচে নির্মিত হলেও স্থাপনাটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চলতে পারবে না। সেখানে বায়ু চলাচল, উত্তাপ ও শীতলীকরণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ পরিবহন এবং কর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
এসব ব্যবস্থা ভূমির ওপরে বা তুলনামূলক অগভীর অংশে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিদ্যুৎ সংযোগ, বায়ু চলাচলের পথ, প্রবেশপথ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরবরাহ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে স্থাপনাটিকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে।
কিন্তু সহায়ক ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং পাহাড়ের গভীরে থাকা মূল পরমাণু অবকাঠামো ধ্বংস করা এক বিষয় নয়।
প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেলে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে ইরান পরে নতুন পথ খনন করে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করে স্থাপনাটি আবার ব্যবহার করতে পারে।
শুধু সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দিলে কি লাভ হবে?
কার্নেগি আন্তর্জাতিক শান্তি তহবিলের পরমাণু নীতিবিষয়ক কাজের সহনেতা জেমস অ্যাকটনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের প্রবেশ সুড়ঙ্গগুলো ধসিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু তাঁর মতে, তাতে কৌশলগত পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
এই মূল্যায়নের মূল যুক্তি হলো, পাহাড়ের গভীরে থাকা যন্ত্রপাতি, ইউরেনিয়াম বা সেন্ট্রিফিউজ যদি অক্ষত থাকে, তাহলে প্রবেশপথ ধ্বংস হলেও স্থাপনাটি স্থায়ীভাবে ধ্বংস হবে না।
এ ছাড়া সুড়ঙ্গ ধসে পড়লে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা ভেতরের অবস্থা যাচাই করতে পারবেন না। ফলে সেখানে কী ধ্বংস হয়েছে, কী অক্ষত আছে বা কী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
সামরিকভাবে একটি স্থাপনা কয়েক মাস বা কয়েক বছর অকার্যকর করে রাখা সম্ভব হলেও ইরানের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রশিক্ষিত জনবল ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই শুধু অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে দেশটির পরমাণু সক্ষমতা স্থায়ীভাবে শেষ করা কঠিন।
স্থল অভিযান আরও জটিল
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রথমত, এলাকাটি ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। দ্বিতীয়ত, প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন বা অন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে সেনা পাঠানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে।
তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ জটিল সুড়ঙ্গব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ নকশা না থাকলে অভিযানে অংশ নেওয়া বাহিনী দিকনির্দেশনা, যোগাযোগ এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সমস্যায় পড়তে পারে।
এ কারণে সম্ভাব্য অভিযানে সরাসরি স্থাপনা দখলের চেয়ে প্রবেশপথ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সহায়ক স্থাপনাগুলোতে আকাশ থেকে হামলার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হামলা হলে কী ঘটতে পারে?
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে হামলা শুধু একটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তাদের পরমাণু স্থাপনায় নতুন মার্কিন হামলা হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইরান পাল্টা হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু, জাহাজ চলাচলের পথ এবং জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। সেখানে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে হামলা ইরানকে আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তেহরান যদি পরিদর্শকদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয় বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা কমিয়ে দেয়, তাহলে দেশটির পরমাণু কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সামরিক হামলা নাকি কূটনৈতিক চাপ?
পিকঅ্যাক্স পাহাড় নিয়ে বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সামরিক হামলার মাধ্যমে থামানো সম্ভব, নাকি কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করাই তুলনামূলক কার্যকর?
সামরিক হামলা কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং কর্মসূচিকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এতে ইরান আরও গোপনে এবং পাহাড়ের আরও গভীরে নতুন স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতায় ইরানকে পরিদর্শন, তথ্য প্রকাশ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা মানতে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোও সহজ নয়।
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত যেকোনো সামরিক সিদ্ধান্ত বড় ধরনের অনিশ্চয়তা বহন করবে।
রহস্যই কি পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের সবচেয়ে বড় শক্তি?
পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শুধু এর ১০০ মিটার গভীরতা নয়; এর প্রকৃত কার্যক্রম ঘিরে থাকা গোপনীয়তাও ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে।
সেখানে সত্যিই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা উন্নত সেন্ট্রিফিউজ থাকলে এটি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হতে পারে। আবার সেখানে এখনো বড় ধরনের পরমাণু কার্যক্রম শুরু না হয়ে থাকলে হামলার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় যুদ্ধ ডেকে আনা হতে পারে।
একদিকে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু উপকরণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থানান্তরের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নথিতে নিশ্চিত নয়। তেহরান আবার পুরো অভিযোগই অস্বীকার করছে।
এই পরস্পরবিরোধী দাবির মাঝেই পিকঅ্যাক্স পাহাড় এখন সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত এই স্থাপনাটি ধ্বংস করা কতটা সম্ভব, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—হামলা চালিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সত্যিই থামানো যাবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে।

