১৮৮৮ সালের তৎকালীন আধুনিক ও উন্নত লন্ডন শহর। গোধূলির আলো-আঁধারিতে হঠাৎ করেই যেন সেখানে নেমে এলো এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের ছায়া। লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকার সরু, ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ও আবছা গলিগুলোতে একের পর এক নৃশংসভাবে খুন হতে লাগলেন অসহায় নারীরা।
এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যার নাম ছড়িয়ে পড়ল, সে আর কেউ নয়—ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ও ছায়াচ্ছন্ন ঘাতক ‘জ্যাক দ্য রিপার’ (Jack the Ripper)। মাত্র ৯০ দিনে ৫ জন অসহায় নারী যৌনকর্মীকে নৃশংসভাবে খুন করেন (যাদের ইতিহাসে ‘Canonical Five’ নামে অভিহিত করা হয়)।
ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য সিরিয়াল কিলারের গল্প রয়েছে, কিন্তু জ্যাক দ্য রিপারের মতো এত বিভৎস, ধূর্ত এবং পৈশাচিক ঘাতক দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য।
“From Hell” এবং পার্সেল বক্সে মানুষের কিডনি: নৃশংসতার চরম অধ্যায়
জ্যাক দ্য রিপারের নৃশংসতার সবচেয়ে রোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো অধ্যায়টি ঘটে ১৮৮৮ সালের অক্টোবর মাসে। হোয়াইটচ্যাপেল ভিজিলেন্স কমিটির প্রধান জর্জ লাস্কের ঠিকানায় ডাকযোগে এসে পৌঁছায় একটি ছোট কাঠের বাক্স।
বাক্সটি খুলতেই উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে যায়—ভেতরে অ্যালকোহলে ডুবিয়ে রাখা ছিল মানুষের কাটা অর্ধেকটা কিডনি! আর তার সাথে ছিল শিউরে ওঠার মতো এক রক্তহিম করা চিঠি, যার শিরোনামে লেখা ছিল: “From Hell” (জাহান্নাম থেকে)।
চিঠিতে অত্যন্ত বিকৃত উল্লাসে ঘাতক লিখেছিল:
“আমি যে নারীর দেহ থেকে এটি কেটে নিয়েছিলাম, তার কিডনির অর্ধেকটা অ্যালকোহলে ভিজিয়ে উপহার হিসেবে তোমাদের পাঠালাম। বাকি অর্ধেকটা আমি ভেজে খেয়ে ফেলেছি… দারুণ সুস্বাদু ছিল! ক্ষমতা থাকলে আমাকে ধরে দেখাও।”
পরবর্তীতে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, কিডনিটি ক্যাথরিন এডোয়েস নামের এক নারী ভিকটিমের, যাকে কয়েকদিন আগেই অলিতে-গলিতে নির্মমভাবে হত্যা করে তার শরীর থেকে কিডনি কেটে নেওয়া হয়েছিল।

ইতিহাসকে স্তব্ধ করে দেওয়া এক অমীমাংসিত রহস্য
‘জ্যাক দ্য রিপার’ কেবল একজন ঘাতক নয়, বরং ইতিহাসকে স্তব্ধ করে দেওয়া এক মহাবিস্ময় ও অমীমাংসিত অধ্যায়। তৎকালীন পুরো লন্ডন শহর, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পুলিশ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ে বছরের পর বছর এক নিষ্ঠুর তামাশা করেছিল এই সিরিয়াল কিলার।
তদন্তের খাতিরে শত শত মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরা হয়েছে, একের পর এক তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু রক্তচোষা এই ঘাতক ধরা তো দূরের কথা—কোনো শক্ত প্রমাণ বা চিহ্নও পেছনে ফেলে যায়নি। সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পুলিশ তার মুখমণ্ডল তো দূরের কথা, কোনো নাম-পরিচয়ও উদ্ধার করতে পারেনি।
আজ ১৩৬ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ও প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে এসেও ‘জ্যাক দ্য রিপার’ নামটি এক বিরাট রহস্যের প্রতীক হয়েই রটে আছে। অন্ধকার গলির সেই অধরা ছায়া-মানব আসলে কে ছিল—তা চিরকালের জন্যই এক কুয়াশাবৃত রহস্য হিসেবে অধরা রয়ে গেল!

