একদিকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে সৌদি আরবকে একই ধরনের স্পর্শকাতর প্রযুক্তি অর্জনের পথ খুলে দেওয়া—যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে।
২২ জুলাই ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি নতুন বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি সৌদি ভূখণ্ডে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
কাগজে-কলমে এটি শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি। কিন্তু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা থাকায় বিষয়টি সাধারণ জ্বালানি সহযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন তাই শুধু সৌদি আরব কেন পরমাণু শক্তি চায়—তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, এত ঝুঁকি জেনেও যুক্তরাষ্ট্র কেন রিয়াদের পাশে দাঁড়াচ্ছে?
কী আছে নতুন চুক্তিতে
নতুন সমঝোতাটি যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তি আইনের ১২৩ ধারার অধীনে করা হয়েছে। এ ধরনের চুক্তি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অন্য কোনো দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি বা উপাদান বিক্রি করতে পারে না।
চুক্তির সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাও স্বাক্ষর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর মাধ্যমে পরমাণু প্রযুক্তি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হবে এবং অস্ত্র তৈরির কাজে সরিয়ে নেওয়া যাবে না।
তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ সমীক্ষার পর সৌদি ভূখণ্ডে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা নির্মাণের পথ খোলা থাকতে পারে। চুক্তিটি সরাসরি এমন স্থাপনা নির্মাণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করছে না, কিন্তু ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আইনি সুযোগ রেখে দিচ্ছে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা এবং নিজের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো। দ্বিতীয়টি এমন একটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যা যথেষ্ট উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথও সংক্ষিপ্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হিসাব: বিশাল বাণিজ্যিক বাজার
সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কয়েক দশকের একটি বিশাল ব্যবসায়িক সুযোগ।
চুক্তির আওতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি পরমাণু কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার পেতে পারে। তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি, পরমাণু জ্বালানি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচালনা প্রযুক্তি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ সরবরাহ করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তর এই অংশীদারত্বকে কয়েক দশকব্যাপী এবং বহু বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য প্রকল্প হিসেবে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় পরমাণু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে। সৌদি আরব বড় আকারের হালকা পানিনির্ভর চুল্লি নির্মাণে আগ্রহী। আলোচনায় ওয়েস্টিংহাউসের এপি১০০০ নকশার চুল্লির কথাও এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক পরমাণু শিল্প রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফ্রান্সের প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। সৌদি আরবের মতো অর্থশালী ক্রেতা পেলে শুধু একটি দেশের বাজার নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তির অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
এ কারণে সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, অস্ত্র বিস্তাররোধের নীতির চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ চুক্তিতে বেশি প্রভাব ফেলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনপ্রণেতা ব্র্যাড শারম্যান প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধকরণের বিরোধিতা করা হলেও সৌদির ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো সৌদি প্রকল্প থেকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় হিসাব: চীন ও রাশিয়াকে দূরে রাখা
যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি না করলেও সৌদি আরব যে তার পরমাণু পরিকল্পনা বাদ দিত, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং রিয়াদ চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স বা দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে যেতে পারত।
সৌদি আরব প্রায় দুই দশক ধরে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে এবং বিভিন্ন সময়ে একাধিক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছে। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে বাস্তব প্রশ্ন ছিল—সৌদি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থেকে সেটির ওপর কিছু প্রভাব রাখা হবে, নাকি সরে দাঁড়িয়ে সেই সুযোগ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির হাতে তুলে দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত যুক্তিটি হলো, মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পে যুক্ত থাকলে সৌদি আরবের পরমাণু কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ওয়াশিংটন বেশি তথ্য পাবে। নিরাপত্তা, পরিদর্শন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
অন্যদিকে সৌদি আরব যদি কম কঠোর শর্তে চীন বা রাশিয়ার কাছ থেকে প্রযুক্তি নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও প্রভাব দুই-ই কমে যাবে। অস্ত্র বিস্তাররোধের পক্ষে কাজ করা কিছু বিশেষজ্ঞও তাই যুক্তি দেন, সম্পূর্ণ বাইরে থাকার চেয়ে শর্তসাপেক্ষে ভেতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হতে পারে।
এটি মূলত দুটি ঝুঁকির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। একটি হলো সৌদির স্পর্শকাতর প্রযুক্তি অর্জনের পথ খুলে দেওয়া। অন্যটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে সৌদি আরব এমন কোনো দেশের সঙ্গে এগিয়ে যাবে, যার নিরাপত্তা ও পরিদর্শন শর্ত আরও দুর্বল হতে পারে।
তৃতীয় হিসাব: সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ রাখা
সৌদি আরব শুধু তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আরব বিশ্বের রাজনীতিতে দেশটির গভীর প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরও সৌদি আরবকে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে চীন, রাশিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনও দেখিয়েছে যে রিয়াদ তার কৌশলগত বিকল্প প্রসারিত করতে চায়।
এমন পরিস্থিতিতে পরমাণু সহযোগিতা ওয়াশিংটনের জন্য সৌদি আরবকে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন প্রযুক্তি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বেঁধে রাখার একটি উপায়। একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়েক বছরের জন্য নির্মিত হয় না। এর নির্মাণ, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার সম্পর্ক বহু দশক ধরে চলে।
অর্থাৎ চুক্তিটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বিক্রির ব্যবস্থা নয়। এটি সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েক প্রজন্মব্যাপী প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরির সুযোগ।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পুরোনো পরিকল্পনা
জো বাইডেনের সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতার অংশ ছিল। পরিকল্পনা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও বেসামরিক পরমাণু সহায়তা দেবে এবং এর বিনিময়ে রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।
কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই পরিকল্পনা বড় বাধার মুখে পড়ে। সৌদি আরব জানায়, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট পথ ছাড়া তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না।
পরবর্তী সময়ে পরমাণু সহযোগিতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয় দুটি আলাদা হয়ে যায়। বর্তমান চুক্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে প্রকাশ্য পূর্বশর্ত করা হয়নি।
এর অর্থ, ওয়াশিংটন এখন সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূল্যকেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে বড় কোনো আঞ্চলিক সাফল্য না পেলেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি পরমাণু বাজার ও কৌশলগত অংশীদারত্ব হাতছাড়া করতে চায়নি।
সৌদি আরব কেন পরমাণু বিদ্যুৎ চায়
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ হয়েও সৌদি আরবকে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পোড়াতে হয়।
২০২৪ সালের হিসাবে দেশটির বিদ্যুতের প্রায় ৬৮ শতাংশ গ্যাস এবং ৩২ শতাংশ তেল পুড়িয়ে উৎপাদিত হতো। ওই বছরের জুনের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মরুভূমির প্রচণ্ড গরমে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা শিল্পকারখানার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এসব কাজে দেশে তেল পোড়ালে রপ্তানির জন্য কম তেল অবশিষ্ট থাকে।
পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে সৌদি আরব ঘরোয়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তেলের ব্যবহার কমাতে পারবে। সাশ্রয় হওয়া তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশটি তার জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করতে পারবে।
এই পরিকল্পনা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত। সৌদি নেতৃত্ব তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, শিল্প, পর্যটন ও আধুনিক অবকাঠামোনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়।
বিদ্যুতের চাহিদা সত্য, কিন্তু সমৃদ্ধকরণ কেন?
সৌদি আরবের বিদ্যুতের প্রয়োজন নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। বিতর্কটি হচ্ছে—বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশটির নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা আদৌ দরকার কি না।
বিশ্বের বহু দেশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে, কিন্তু নিজেরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে না। তারা আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনে।
সমালোচকদের মতে, সৌদি আরবের প্রথম পরমাণু চুল্লি চালু হওয়ার বহু আগেই নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সুবিধা চাওয়ার শক্তিশালী বাণিজ্যিক কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কেনা তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাশ্রয়ী হতে পারে।
সৌদি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, দেশে থাকা ইউরেনিয়ামের মজুত ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ পরমাণু জ্বালানি শিল্প গড়ে তুলতে চান তারা। ভবিষ্যতে সৌদি চুল্লির জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ইউরেনিয়ামজাত পণ্য বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু এ ধরনের সক্ষমতা সৌদি আরবকে শুধু একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বানাবে না। প্রয়োজন হলে দ্রুত সামরিক কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রযুক্তিগত ভিত্তিও তৈরি করবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ: পরমাণু অস্ত্রের পথ
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মানেই কোনো দেশ পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে—এমন নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি তৈরিতেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়।
তবে একই যন্ত্রপাতি ও জ্ঞান ব্যবহার করে ধাপে ধাপে আরও উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা যায়। অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান অর্জনের সবচেয়ে কঠিন প্রযুক্তিগত ধাপগুলোর একটি এটি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে বলেছেন, ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করলে সৌদি আরবও যত দ্রুত সম্ভব একই পথে যাবে। তাঁর এই বক্তব্যের কারণে সৌদি সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে শুধু শান্তিপূর্ণ জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে দেখতে অনেক বিশেষজ্ঞ দ্বিধা করছেন।
বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়েছে কারণ চুক্তিটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্য দেখিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
ফলে সমালোচকেরা প্রশ্ন করছেন, ইরানের ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তিকে সম্ভাব্য অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বলা হচ্ছে, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে সেই একই সক্ষমতা কেন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন নেই কেন
চুক্তিকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ার আরেকটি কারণ হলো, এতে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানানো হয়েছে।
এই প্রটোকল কার্যকর থাকলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকেরা ঘোষিত পরমাণু স্থাপনার বাইরে সন্দেহজনক কার্যক্রমও অনুসন্ধান করতে পারেন। আরও বিস্তৃত তথ্য চাওয়া, অতিরিক্ত স্থাপনা পরিদর্শন এবং অঘোষিত কর্মকাণ্ড শনাক্ত করার সুযোগও বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান আইন যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি সৃষ্টি করে—এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র করবে না।
কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য হলো, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে যাচাইযোগ্য, নিয়মিত ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক পরিদর্শনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় শর্ত দুর্বল
যুক্তরাষ্ট্র আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি করেছিল, সেটিকে অস্ত্র বিস্তাররোধের আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হতো।
সেই চুক্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যবহৃত পরমাণু জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কমানোর জন্য এই দুটি শর্তকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।
সৌদি আরব একই ধরনের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়নি। অতীতের একাধিক মার্কিন প্রশাসন রিয়াদকে কঠোর মানদণ্ডে রাজি করানোর চেষ্টা করলেও সফল হয়নি।
এখন সৌদি দাবির কাছে নমনীয় হওয়া অন্য দেশগুলোকেও একই সুবিধা চাওয়ার উৎসাহ দিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশ প্রশ্ন তুলতে পারে—সৌদি আরবকে অনুমতি দেওয়া হলে তাদের কেন দেওয়া হবে না?
এভাবে একটি ব্যতিক্রম ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অস্ত্র বিস্তাররোধের নিয়ম দুর্বল করে দিতে পারে।
কংগ্রেস কি চুক্তি থামাতে পারবে
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। আইনপ্রণেতারা এটি পরীক্ষা করার জন্য ৯০ দিন সময় পাবেন।
তবে প্রচলিত ১২৩ ধারার চুক্তি অনুমোদনের জন্য সাধারণত কংগ্রেসের ইতিবাচক ভোটের প্রয়োজন হয় না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কংগ্রেস কার্যকরভাবে বিরোধিতা করতে না পারলে চুক্তি এগিয়ে যেতে পারে।
চুক্তি আটকে দিতে উভয় কক্ষে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হতে পারে, যা প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ভেটোও অতিক্রম করতে সক্ষম। ফলে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও চুক্তিটি ঠেকানো সহজ হবে না।
তবু কংগ্রেসের বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে চুক্তির গোপন বা অপ্রকাশিত অংশ, সুরক্ষা ব্যবস্থা, সমৃদ্ধকরণের শর্ত এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কি পুরোপুরি অযৌক্তিক?
চুক্তির ঝুঁকি গুরুতর হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যবসায়িক লোভ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা সম্ভবত মনে করছেন, সৌদি আরবের পরমাণু পরিকল্পনা থামানো এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে রিয়াদ অন্য অংশীদার খুঁজে নেবে। সে ক্ষেত্রে মার্কিন পরিদর্শন, প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আরও কমে যাবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি কর্মসূচির ভেতরে থাকতে চাইছে, যা বাইরে থেকেও এগিয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে চুক্তিটি মার্কিন পরমাণু শিল্পকে বড় বাজার দেবে, সৌদি আরবকে চীন ও রাশিয়ার প্রযুক্তি বলয় থেকে দূরে রাখবে এবং দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি করবে।
কিন্তু এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তব সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার কাছে কার্যকর পরিদর্শন, প্রযুক্তি বন্ধ করার ক্ষমতা এবং চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভবিষ্যতের সরকার
বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিলেও একটি পরমাণু স্থাপনা ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পরিচালিত হবে। এই সময়ে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
আজ যে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ, ভবিষ্যতের সরকার একই সম্পর্ক বজায় রাখবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি দেশের হাতে সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তি চলে গেলে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর সেই জ্ঞান ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
পরমাণু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাই শুধু বর্তমান উদ্দেশ্য বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। সক্ষমতাটি ভবিষ্যতে কার হাতে থাকবে এবং সংকটের সময় কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করতে হয়।
এই কারণেই সমালোচকেরা বলছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বর্তমান জোটের ওপর নির্ভর করে কয়েক দশকের পরমাণু ঝুঁকি নেওয়া বিপজ্জনক।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
সৌদি আরব নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পেলে তুরস্ক, মিশর এবং অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোও নিজেদের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করতে পারে।
তারা সঙ্গে সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেবে—এমন নয়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সম্ভাব্য সক্ষমতার জবাবে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, গবেষণা বা জ্বালানি কর্মসূচি বাড়াতে পারে।
এর ফলে একটি প্রকাশ্য অস্ত্র প্রতিযোগিতার আগেই ছায়া প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। বিভিন্ন দেশ এমন প্রযুক্তি অর্জন করতে চাইবে, যা প্রয়োজনে দ্রুত সামরিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
এই ধরনের পরিস্থিতিকে পরমাণু ঝুঁকি ধরে রাখা বলা যায়। কোনো দেশ বোমা তৈরি না করেও বোমা তৈরির কাছাকাছি পৌঁছানোর সক্ষমতা নিজের হাতে রাখে।
ওয়াশিংটনের বড় বাজি
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করছে মূলত চারটি কারণে।
প্রথমত, সৌদি আরবের বিশাল পরমাণু বাজার মার্কিন প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখতে চায়। দ্বিতীয়ত, চীন ও রাশিয়াকে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে ঠেকাতে চায়। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখতে চায়। চতুর্থত, ওয়াশিংটন মনে করছে সৌদি কর্মসূচির বাইরে থাকার চেয়ে ভেতরে থেকে তার ওপর প্রভাব রাখাই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
কিন্তু এই হিসাবের বিপরীতে রয়েছে অত্যন্ত বড় ঝুঁকি। চুক্তিটি সৌদি আরবকে অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের মান দুর্বল করতে পারে এবং অন্য দেশগুলোকে একই সুবিধা দাবি করতে উৎসাহিত করতে পারে।
সুতরাং এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ চুক্তি নয়। এটি এমন একটি কৌশলগত বাজি, যেখানে তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক লাভের বিনিময়ে ভবিষ্যতের পরমাণু ঝুঁকি গ্রহণ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আশা, সৌদি আরবকে কাছে রাখলে তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, একবার কোনো দেশ সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলে সেই সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।
চুক্তিটি সফল হলে সৌদি আরব শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি পাবে, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বাজার পাবে এবং ওয়াশিংটন রিয়াদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখবে। ব্যর্থ হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু প্রতিযোগিতার সূচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিস্তাররোধ নীতির বড় দুর্বলতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে।

