ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির সংকটে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যে মাত্রায় বাড়তে পারত, তা হয়নি। এর পেছনে এবার শুধু তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত নয়, বড় ভূমিকা রাখছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীন। আমদানি কমানো, বিশাল মজুত ব্যবহার এবং পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেইজিং এমন এক অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে তেলের বাজারে শুধু সরবরাহকারীরাই নয়, একজন বড় ক্রেতাও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারছে।
দীর্ঘদিন ধরে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল ওপেক ও পরে ওপেক প্লাস জোটের। উৎপাদন কমিয়ে বা বাড়িয়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সৌদি আরবসহ বড় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রভাবিত করতে পারত। কিন্তু চলতি বছরের ইরান যুদ্ধ সেই হিসাব অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এপ্রিলের শেষ দিকে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের বেশি উঠেছিল। কিন্তু একই সময়ে চীনসহ এশিয়ার বড় ক্রেতারা তেল কেনা কমিয়ে দেওয়ায় সরবরাহ সংকটের ধাক্কা কিছুটা সামলে যায়।
এখানেই চীনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাইয়ে চীন প্রতিদিন গড়ে ৮৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এক বছর আগের জুলাইয়ের তুলনায় এটি ২৪ শতাংশের বেশি কম। জুন ও জুলাই এই দুই মাস মিলিয়ে চীনের দৈনিক আমদানি গড়ে ছিল প্রায় ৭৮ লাখ ব্যারেল, যেখানে যুদ্ধের আগে গড় আমদানি ছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ চীন নিজে কম তেল কিনে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া ঠেকিয়েছে। বিশাল মজুত থেকে তেল ব্যবহার করার সুযোগ থাকায় বেইজিংয়ের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
চীনের এই অবস্থান হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে দেশটি কৌশলগত তেল মজুত বাড়িয়েছে, স্থানীয় জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং পরিবহন খাতে তেলের বিকল্প তৈরি করেছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, চীনের তেলের মজুত এক বিলিয়ন ব্যারেলের অনেক ওপরে। রয়টার্সের আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংকটের সময় চীন বিপুল মজুত ব্যবহার করে আমদানির ওপর চাপ কমিয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় দেশটির পরিবহন খাতে তেলের চাহিদার একটি অংশও কমেছে। ফলে আগে যেখানে তেলের দাম বাড়লে চীনকে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিপুল পরিমাণ তেল কিনতে হতো, এখন প্রয়োজন হলে আমদানি কমিয়ে দেওয়ার মতো বিকল্প তার হাতে রয়েছে।
এটি তেলের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। কারণ এত দিন বাজারের ক্ষমতার মূল হিসাব ছিল, কে কত তেল উৎপাদন করতে পারছে। ওপেকের হাতে ছিল সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর বা উৎপাদন বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যদি প্রয়োজনের সময় নিজের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে, তাহলে উৎপাদকদের ওপরও চাপ তৈরি হবে। চীন এরই মধ্যে এমন ভূমিকা পালন করেছে। জুনে দেশটির তেল আমদানি প্রায় এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। পরে জুলাইয়ে কিছুটা বাড়লেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম ছিল। এই চাহিদা কমে যাওয়াই এশিয়ার তেলবাজারে সরবরাহের ঘাটতি সামলানোর অন্যতম কারণ হয়েছে।
অন্যদিকে ওপেকের ক্ষমতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ১ মে থেকে ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রায় ছয় দশক সদস্য থাকার পর দেশটির এই সিদ্ধান্ত জোটের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন উৎপাদন বাড়ানো ও বাজারে তেল বিক্রির ক্ষেত্রে আগের মতো ওপেকের কোটা মেনে চলতে বাধ্য নয়। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে উৎপাদক জোটের ভেতরের সমন্বয় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ওপেকের যুগ শেষ হয়ে গেছে বা চীন একাই তেলের দাম নির্ধারণ করছে। বরং বাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকরা আবার সরবরাহ বাড়াতে পারবেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা ও গায়ানার মতো দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহ বাড়লে তেলের দাম কমার চাপও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে নতুন তেলক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে গেলে সরবরাহ আবার সংকুচিত হতে পারে। তখন সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় উৎপাদকদের হাতে থাকা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আবার বেড়ে যেতে পারে।
চীনের জন্যও এই প্রভাব চিরস্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে এবং পরিবহন ব্যবস্থায় রেলপথের ব্যবহারও অনেক বেশি। ফলে দীর্ঘমেয়াদে চীনের তেলের চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু এর অর্থ একই সঙ্গে এটাও চীন ভবিষ্যতে তেল আমদানির বাজারে আরও বড় ‘সুইং বায়ার’ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ দাম কম থাকলে বেশি তেল কিনবে, আবার সংকট বা দাম বেড়ে গেলে আমদানি কমিয়ে দিতে পারবে। এমন আচরণ বাজারের ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম বা স্থিতিশীল থাকলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কমে। তবে কোনো একটি দেশ বা একটি অঞ্চলের ওপর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চীনের মতো বড় ক্রেতার বাজারক্ষমতা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল হবে তেলের উৎস বহুমুখী করা, বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো।

