২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ফ্লোরিডার পাম বিচ বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কাতারের রাজপরিবারের জন্য সাজানো একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮ ঘুরে দেখছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুইতলা উড়োজাহাজটির ভেতরে ছিল কাঠ ও চামড়ায় সাজানো প্রশস্ত শয়নকক্ষ, ঝাড়বাতিওয়ালা লাউঞ্জ এবং সোয়েডে মোড়ানো আসন। বিমানটি দেখে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগেনি—বোয়িংয়ের স্থায়ী নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান আসার আগ পর্যন্ত এটিই হবে তাঁর প্রেসিডেন্টবাহী উড়োজাহাজ।
কিন্তু একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত বিমানকে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজে রূপান্তর করা সাধারণ সংস্কারকাজ নয়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিমানটি আকাশে তোলার তাড়াহুড়া প্রকল্পের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এমন কিছু নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আগের এয়ার ফোর্স ওয়ানে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন এরিক লিপটন, টাইলার পেজার ও ম্যাগি হ্যাবারম্যান।
কয়েক বছরের কাজ শেষ করা হলো আট মাসে
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সাধারণ ৭৪৭-৮-কে পূর্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টবাহী বিমানে রূপান্তর করতে কয়েক বছর প্রয়োজন। কাতারের দেওয়া বিমানটির কাজ শেষ করা হয় মাত্র আট মাসের মতো সময়ে। এত কম সময়ের কারণে হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা প্রথমে ধরে নিয়েছিলেন, বিমানটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অথবা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে—এমন নিরাপদ মিত্রদেশে ব্যবহৃত হবে।
দ্রুত কাজ শেষ করার এই চাপের পেছনে ছিল ট্রাম্পের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা। তিনি চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির আগেই—২০২৬ সালের ৪ জুলাইয়ের মধ্যে—বিমানটি প্রস্তুত হোক। প্রথমদিকে কর্মকর্তারা কাজটি শেষ করতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগবে বলে মনে করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সময়সীমা কমে এক বছরেরও নিচে নেমে আসে। ট্রাম্প নিজে বিমানের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বাইরের রং, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কোন কোন নিরাপত্তা সুবিধা রাখা হবে—এসব সিদ্ধান্তে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিমানটি সংস্কারের দায়িত্ব পায় প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এলথ্রি হ্যারিস। কাজ শুরুর আগে পুরো বিমানটি আড়িপাতার যন্ত্র বা সন্দেহজনক ইলেকট্রনিক সামগ্রীর জন্য পরীক্ষা করা হয়। পরে প্রায় ৪০০ কর্মী তিন পালায় দিনরাত কাজ করেন। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন ছিল তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
যে নিরাপত্তা সুবিধাগুলো দেখা যাচ্ছে না
পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বিমানের নিচের দিকে নিজস্ব সিঁড়িসহ একটি প্রবেশপথ। এর ফলে বিদেশি বিমানবন্দরের সিঁড়ি বা অন্য কোনো স্থল-সরঞ্জামের ওপর নির্ভর না করেই প্রেসিডেন্ট দ্রুত বিমানে উঠতে বা নামতে পারেন। নিরাপত্তাঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে কাজে লাগে।
কিন্তু কাতারের দেওয়া নতুন বিমানটিতে এমন নিচু প্রবেশপথ বা নিজস্ব সিঁড়ি নেই বলে ছবি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে ওঠানামার সিঁড়ির সংখ্যা কমানো হয়েছে।
পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ইনফ্রারেড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও দৃশ্যমান। এটি কাছাকাছি আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও অনুসরণ করে এবং শক্তিশালী লেজারের মাধ্যমে সেটির গতিপথ ব্যাহত করতে পারে। নতুন বিমানটির প্রকাশিত ছবিতে পুরোনো বিমানের মতো সেই ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তবে অন্য কোনো গোপন আত্মরক্ষাব্যবস্থা যোগ করা হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। হোয়াইট হাউস বিমানটিকে “নিরাপদ ও সুরক্ষিত” বললেও এর নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রকাশ করেনি।
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও পার্থক্য আছে। নিয়মিত এয়ার ফোর্স ওয়ানে দুটি সহায়ক বিদ্যুৎ ইউনিট থাকে। মূল ব্যবস্থায় সমস্যা হলে এগুলো আকাশে থাকা অবস্থায়ও যোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু রাখতে পারে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে চারটি ইঞ্জিন দ্রুত চালু করতেও সাহায্য করে। কিন্তু নতুন বিমানটিতে দৃশ্যমানভাবে মাত্র একটি ইউনিট রয়েছে। একজন ফেডারেল কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, দ্বিতীয়টি স্থাপন করা হয়নি।
কাঠামোগত ত্রুটি ও বিশেষ অনুমোদনের প্রশ্ন
বোয়িং ৭৪৭-৮ মডেলের কিছু বিমানে ফিউজলাজ বা মূল কাঠামোর সহায়ক রডে ফাটল দেখা যাওয়ার বিষয়ে ২০২৩ সাল থেকে সতর্ক করে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফএএ। সংস্থাটি বলেছে, এসব ফাটল বিমানের কাঠামোগত নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কাতারের বিমানটিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মেরামত সম্পন্ন হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস দাবি করলেও কাজটি ইতোমধ্যে করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেনি।
বিমানটির কিছু আসন পাশের দিকে মুখ করা। এ ধরনের অস্বাভাবিক আসনবিন্যাসের ক্ষেত্রে জরুরি অবতরণে যাত্রীরা নিরাপদ থাকবেন কি না, তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরীক্ষা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এফএএর কাছে একটি বিশেষ অনুমোদন চেয়েছিল। ট্রাম্প যেদিন প্রথম বিমানটিতে ভ্রমণ করেন, সেদিনই অনুমোদনের নোটিশ প্রকাশ করা হয়—যদিও অনুমোদনটি কয়েক দিন আগেই দেওয়া হয়েছিল। হোয়াইট হাউস বলেছে, বিমানটি নিরাপদভাবে পরিচালনার জন্য বিমানবাহিনী এফএএর সঙ্গে কাজ করেছে।
‘উপহার’ হলেও খরচ শত শত মিলিয়ন ডলার
কাতার বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরকে উপহার হিসেবে দিলেও সেটিকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে রূপান্তর করা মোটেও বিনা খরচের প্রকল্প ছিল না। প্রকাশ্যে স্বীকার করা সংস্কার ব্যয় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে নতুন মডেলের বিমান চালানোর জন্য পাইলটদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দিতে আলাদা ৭৪৭-৮ ভাড়া করতে হয়।
পরবর্তী সময়ে লুফথানসার কাছ থেকে আরও দুটি বিমান কেনা হয়—একটি প্রশিক্ষণের জন্য, অন্যটি খুচরা যন্ত্রাংশের উৎস হিসেবে। বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তার মতে, এ দুটির মূল্যও প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
প্রকল্পটির মোট অর্থায়ন কীভাবে হয়েছে, প্রশাসন তা বিস্তারিত জানায়নি। তবে বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক সিনেটে স্বীকার করেন, ‘সেন্টিনেল’ নামে পারমাণবিক আধুনিকায়ন কর্মসূচির অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। আগের গ্রীষ্মে ওই কর্মসূচি থেকে ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার একটি নাম প্রকাশ না করা গোপন প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস্টোফার মারফির অভিযোগ, ব্যয় ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি এড়াতেই অর্থায়নকে গোপন রাখা হয়েছে।
এদিকে বোয়িং যে দুটি স্থায়ী নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান তৈরি করছে, সেই বৃহত্তর আধুনিকায়ন প্রকল্পের সর্বশেষ আনুমানিক ব্যয় ৫.১ বিলিয়ন ডলার। বিমান দুটি ২০২৮ সালে প্রস্তুত হওয়ার কথা—মূল পরিকল্পনা শুরুর প্রায় ১৩ বছর পর।
রং নিয়েও ছিল ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত
১৯৬২ সালে জন ও জ্যাকুলিন কেনেডির সময় থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানের পরিচিত রং হালকা নীল ও সাদা। ট্রাম্প এর বদলে লাল, সাদা, সোনালি ও গাঢ় নীল রং চেয়েছিলেন। এর আগে বিমানবাহিনী গাঢ় রঙের কারণে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়ে নিচের অংশে থাকা সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রে সমস্যা হতে পারে বলে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু সেই আপত্তি উপেক্ষা করে নতুন নকশা অনুমোদিত হয়।
১ জুলাই বিমানটি প্রথমবার ট্রাম্পকে নিয়ে নর্থ ডাকোটায় যায়। বিমানে ওঠার আগে তিনি এর নিচের একটি যান্ত্রিক প্যানেলে মার্কার দিয়ে নিজের নামও লেখেন। কয়েক দিন পর তিনি নতুন বিমানটিতে করে ন্যাটো বৈঠকে অংশ নিতে তুরস্ক যান।
বাস্তব হুমকির মুখে আবার পুরোনো বিমানে
নতুন বিমানটির নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সামনে আসে তুরস্ক সফরের সময়। মার্কিন কর্মকর্তারা তথ্য পান, ইরান-সমর্থিত কোনো গোষ্ঠী ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি তৈরি করেছে। সিক্রেট সার্ভিস তখন তাঁর ফেরার পরিকল্পনা বদলানোর পরামর্শ দেয়।
ফলে নতুন কাতারি বিমানটি আগে যুক্তরাজ্যের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ট্রাম্প তুরস্ক ছাড়েন পুরোনো, বেশি সুরক্ষিত এয়ার ফোর্স ওয়ানে। পরে যুক্তরাজ্যে গিয়ে তিনি আবার নতুন বিমানটিতে ওঠেন।
হোয়াইট হাউস অবশ্য বলে আসছে, বিমানটি প্রেসিডেন্টের ভ্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং নিরাপদ। বিমানবাহিনীও দ্রুত সংস্কারকে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবু প্রশাসন জানিয়েছে, শরৎকালে বিমানটিকে আবার সাময়িকভাবে পরিষেবা থেকে সরিয়ে আরও উন্নয়ন ও পরিবর্তনের কাজ করা হবে।
শেষ পর্যন্ত এই বিমানকে ঘিরে গল্পটি শুধু একটি উড়োজাহাজের নয়। এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রুচি, দ্রুত ফল দেখানোর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রদর্শন এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার কঠোর বাস্তবতার সংঘাতের গল্প। নতুন বিমানটি সময়মতো আকাশে উঠেছে—কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং কতটা নিরাপত্তা ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি মেটেনি।

