বিশ্বের মানচিত্রে মালাক্কা প্রণালি দেখতে খুব বড় কোনো জলপথ নয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রতিদিন যেভাবে জ্বালানি, শিল্পপণ্য, কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, তাতে এই সরু পথটি কার্যত বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনিতে পরিণত হয়েছে। এখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বাজারও এর ধাক্কা অনুভব করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিমাণগত হিসাবে সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। অথচ এই বিপুল পণ্যপ্রবাহের বড় একটি অংশকে কয়েকটি সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করতে হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। অন্যদিকে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা মালাক্কা প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক চলাচলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়।
এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, মালাক্কা কোনো সাধারণ আঞ্চলিক নৌপথ নয়। এটি এমন একটি বৈশ্বিক সংযোগস্থল, যেখানে সামান্য বিঘ্নও উৎপাদন, পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্যমূল্যের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সমুদ্রপথের সংকট এখন আর আঞ্চলিক নয়
২০২৩ সালে লোহিত সাগরের সংকট বিশ্বকে প্রথম বড় সতর্কবার্তা দিয়েছিল। বাব এল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হুতি হামলার কারণে অনেক নৌযানকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হয়েছিল। এতে পরিবহনের সময়, জ্বালানি ব্যয় এবং বিমার খরচ বেড়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ইরান রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় আরেকটি বাস্তবতা সামনে আসে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে কোনো রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
কোনো প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও সেখানে হামলার আশঙ্কা বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যায়। অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বহন করলেও তার একটি বড় অংশ ভোক্তার ওপর পড়ে।
অর্থাৎ একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বাজারে খাদ্য, জ্বালানি, ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে দৃশ্যমান হতে পারে।
হরমুজ ও মালাক্কার ঝুঁকি এক নয়
হরমুজ এবং মালাক্কা—দুটি প্রণালিই বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের ঝুঁকির ধরন আলাদা।
হরমুজের প্রধান দুর্বলতা রাজনৈতিক। কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্র রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্যে সেখানে জাহাজ চলাচল সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে। অর্থাৎ হরমুজে সংকট সৃষ্টির পেছনে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা সংঘাতের বড় ভূমিকা থাকতে পারে।
মালাক্কার গুরুত্ব ও দুর্বলতা মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিপুল জাহাজ চলাচলের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন সৃষ্টি হলে শুধু একটি জ্বালানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে চলমান সামগ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থাই চাপে পড়বে।
এশিয়ার অনেক দেশ তাদের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি এবং বিপুল পরিমাণ শিল্প কাঁচামালের জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মালাক্কায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পোৎপাদনে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজে বিঘ্ন মূলত জ্বালানি সরবরাহকে বড় ধরনের আঘাত করতে পারে। কিন্তু মালাক্কায় বিঘ্ন জ্বালানির পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং ভোগ্যপণ্য পরিবহনেও বাধা সৃষ্টি করবে। এই কারণেই মালাক্কা বন্ধ হওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ এবং মালয় উপদ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালি প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ।
এই প্রণালি ভারত মহাসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেখান থেকে জাহাজগুলো প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে যেতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল, ইউরোপের পণ্য এবং এশিয়ার শিল্পপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি একটি কেন্দ্রীয় পথ হিসেবে কাজ করে।
তবে মালাক্কার সবচেয়ে বড় সুবিধাই একই সঙ্গে এর প্রধান দুর্বলতা। সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপ প্রণালিপথ এলাকায় এর প্রস্থ কমে ৩ কিলোমিটারেরও নিচে নেমে এসেছে। এত সরু পথে বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করায় দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ এবং যানজটের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
জলদস্যুতা আগের দশকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোনো দুর্ঘটনায় বড় জাহাজ পথের মাঝখানে আটকে গেলে সাময়িকভাবেও পুরো নৌপথে গুরুতর জট তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে মালাক্কার ভূমিকা
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মালাক্কা প্রণালি দিয়ে যায়। এই পরিমাণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের অংশের চেয়েও বেশি।
হরমুজ ও মালাক্কার মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্রও রয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে পূর্ব এশিয়ার দিকে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রথমে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। এরপর সেই তেল মালাক্কা দিয়ে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে যায়।
ফলে হরমুজ এবং মালাক্কার যেকোনো একটিতে সংকট দেখা দিলে পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। আর দুটি পথেই একই সময়ে সমস্যা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হবে।
এখানে মূল বিষয় শুধু তেলের দাম নয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারখানার ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। তাই মালাক্কার নিরাপত্তা প্রত্যক্ষভাবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই মালাক্কা
সুয়েজ বা পানামার মতো মালাক্কা মানুষের তৈরি খাল নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রণালি এবং এর তীরবর্তী তিন দেশ—ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর—এর নিরাপত্তা ও নৌচলাচল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে।
১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদের অধীনে মালাক্কায় সব দেশের জাহাজের অবিচ্ছিন্ন ও দ্রুত চলাচলের অধিকার স্বীকৃত। তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছামতো জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে, অযৌক্তিক বাধা দিতে বা পথ ব্যবহারের জন্য কর আরোপ করতে পারে না।
এই আইনি কাঠামো মালাক্কায় সংকটের সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর করেনি। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পথ বন্ধ করা অনেক কঠিন করে তুলেছে। বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ না হলে মালাক্কাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
তবে আইনের উপস্থিতি মানেই সব ঝুঁকি দূর হওয়া নয়। দুর্ঘটনা, জাহাজের সংঘর্ষ, নাশকতা, জলদস্যুতা, সামরিক উত্তেজনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চলাচল ব্যাহত হতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক অবরোধের সম্ভাবনা কম হলেও পরিচালনাগত ঝুঁকি যথেষ্ট বাস্তব।
বিকল্প পথ আছে, কিন্তু সমাধান নেই
মালাক্কা বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলো সুন্দা, লম্বক এবং মাকাসার প্রণালি ব্যবহার করতে পারে। এসব পথ ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপমালার মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।
কিন্তু কোনো পথই মালাক্কার সমান কার্যকর নয়। সুন্দা প্রণালিতে নৌচলাচলের বেশ কিছু ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লম্বক ও মাকাসার দিয়ে বড় জাহাজ চলতে পারলেও সেগুলো ব্যবহার করলে পথ অনেক দীর্ঘ হয়।
দীর্ঘ পথ মানে বেশি সময়, বেশি জ্বালানি এবং বেশি পরিবহন ব্যয়। ফলে বিকল্প পথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়া ঠেকানো সম্ভব হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে না।
এই বাস্তবতাই মালাক্কাকে অন্য অনেক নৌপথ থেকে আলাদা করেছে। এর বিকল্প রয়েছে, কিন্তু একই ধরনের গতি, ধারণক্ষমতা এবং কম খরচের কোনো পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নেই।
তিন দেশের সহযোগিতায় টিকে আছে স্থিতিশীলতা
মালাক্কার নিরাপত্তা অনেকাংশে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে দেশগুলো যৌথ নৌটহল, জলদস্যুবিরোধী অভিযান এবং জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
তিন দেশই বোঝে, নৌচলাচল বন্ধ হলে তাদের নিজস্ব অর্থনীতিই সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মালাক্কা উন্মুক্ত রাখা তাদের কাছে শুধু আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।
একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের পক্ষে পুরো প্রণালি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা তিন দেশকে সহযোগিতা করতে বাধ্য করেছে।
তবে সহযোগিতা থাকলেও তাদের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। প্রত্যেক দেশ মালাক্কাকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান থেকে দেখে।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার আলাদা হিসাব
মালাক্কায় সমস্যা হলে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক, আর্থিক ও পণ্য পুনঃপরিবহন কেন্দ্র হিসেবে দেশটির অর্থনৈতিক সাফল্য সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সিঙ্গাপুরের বন্দর বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম পণ্যবাহী বাক্স পরিবহন বন্দর। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজের বড় একটি অংশ এখানে পণ্য ওঠানো-নামানো বা পুনর্বিন্যাসের কাজ করে। ফলে মালাক্কায় দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিকেই আঘাত করবে।
মালয়েশিয়ার জন্যও প্রণালিটির স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পোর্ট ক্লাংসহ দেশটির প্রধান বন্দরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান মালাক্কার নিরবচ্ছিন্ন নৌচলাচলের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান আরও জটিল এবং কৌশলগত। মালাক্কার বড় অংশের উপকূলের পাশাপাশি সুন্দা ও লম্বক প্রণালিও ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন। মালাক্কায় সমস্যা হলে এই দুটি পথ প্রধান বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে মূল পথ ও বিকল্প পথ—উভয়ের ওপর প্রভাব রাখার সুযোগ ইন্দোনেশিয়াকে বিশেষ ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে।
জাহাজের ওপর পথ ব্যবহারের কর আরোপের বিতর্ক
ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি প্রাবোও সুবিয়ান্তো দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানকে বারবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাকার্তার দৃষ্টিতে এসব জলপথ শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এগুলো আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমও হতে পারে।
চলতি বছরের হরমুজ সংকটের সময় ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া মালাক্কা অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর পথ ব্যবহারের কর আরোপের ধারণা সামনে এনেছিলেন।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর দ্রুত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমালোচনা শুরু হয়। পরে ইন্দোনেশিয়া প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত না হলেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখিয়েছে, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্মুক্ত সম্পদ হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরির মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করতে শুরু করতে পারে।
এ ধরনের চিন্তা ভবিষ্যতে বাড়লে সমুদ্রপথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক জলপথও রাজনৈতিক দর-কষাকষির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
চীনের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক দুশ্চিন্তা
মালাক্কার ভবিষ্যৎ শুধু তিন উপকূলীয় দেশের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতাও এই প্রণালির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হু চিনতাও প্রথমবারের মতো “মালাক্কা সংকট” ধারণাটি সামনে আনেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর চীনের নির্ভরতার কথা বোঝান, যেটি বেইজিংয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই।
দুই দশকেরও বেশি সময় পরও এই উদ্বেগ কমেনি। চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এখনো মালাক্কা প্রণালি দিয়ে যায়। একই পথ দিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে চীনের বিপুল পরিমাণ তৈরি পণ্য পাঠানো হয়।
তাই তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত, চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আরও অবনতি অথবা ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে বড় সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে মালাক্কা চীনের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
প্রণালিটি পুরোপুরি অবরোধ করা না হলেও জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, অতিরিক্ত তল্লাশি বা নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করা হলে চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
নির্ভরতা কমাতে চীনের দুই কৌশল
মালাক্কার ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন প্রধানত দুটি পথ অনুসরণ করছে।
প্রথমত, দেশটি দক্ষিণ চীন সাগর এবং আশপাশের জলসীমায় নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো চীনের বাণিজ্যিক নৌপথ এবং জ্বালানি সরবরাহের পথ রক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের বিরোধকে শুধু দ্বীপ বা জলসীমার মালিকানা নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। এর সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, চীন স্থলভিত্তিক ও বিকল্প পরিবহনপথ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর ইউনান প্রদেশকে বঙ্গোপসাগরের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একইভাবে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে শিনজিয়াংকে আরব সাগরের গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন যথাক্রমে ২০১৩ এবং ২০১৭ সাল থেকে চালু থাকলেও তা চীনের মোট জ্বালানি চাহিদার সামান্য অংশ পূরণ করতে পারে।
মিয়ানমার ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্গম ভূগোল এবং নিরাপত্তা সমস্যা এসব পথের পূর্ণ ব্যবহারকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে বর্তমানে কোনো বিকল্পই মালাক্কার গতি, ধারণক্ষমতা ও কম খরচের সমন্বয় দিতে পারছে না।
মালাক্কার চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম থেকে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া পর্যন্ত দেশটির সামরিক অবস্থান বিস্তৃত।
১৯৯০ সালের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ পায়। ২০০৫ সালের কৌশলগত কাঠামো চুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো হয়।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। ২০২৫ সালে ওয়াশিংটন মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে প্রধান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারত্বে উন্নীত করে।
এর ফলে মালাক্কা প্রণালিতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করে না, কিন্তু এর চারপাশের কৌশলগত পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এই অবস্থান চীনের উদ্বেগ আরও বাড়ায়। কারণ চীনের অর্থনীতি যে নৌপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, সেই পথের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদারদের উপস্থিতি রয়েছে।
মালাক্কা বন্ধ হলে কী হতে পারে
মালাক্কায় দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে প্রথমে জাহাজগুলো বিকল্প পথে সরিয়ে নেওয়া হবে। এতে যাত্রার সময় বাড়বে এবং বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হবে। পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ও পণ্যের বিমা খরচও বাড়তে পারে।
এরপর পূর্ব এশিয়ার তেল ও গ্যাস সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হবে। শিল্পকারখানায় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
মালাক্কার মাধ্যমে যেসব পণ্য ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় যায়, সেগুলোর সরবরাহেও বিলম্ব হবে। এ অবস্থায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত মজুত গড়ে তুলতে শুরু করলে বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ মালাক্কা সংকট শুধু জাহাজের যাত্রাপথের সমস্যা হবে না। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহশৃঙ্খল, মূল্যস্ফীতি এবং রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত সম্পর্ককে একসঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে।
মালাক্কা প্রণালির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অবস্থান। একই কারণে এটিই এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বিশ্ববাণিজ্যের বিপুল অংশ এমন একটি সরু পথের ওপর নির্ভর করছে, যার কার্যকর ও সাশ্রয়ী বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন, ইন্দোনেশিয়া–মালয়েশিয়া–সিঙ্গাপুরের সহযোগিতা এবং সব পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রণালিটিকে সচল রেখেছে। তাই রাজনৈতিকভাবে মালাক্কা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো কম। কিন্তু কম সম্ভাবনা মানে ঝুঁকিহীনতা নয়।
চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংঘাত, নৌদুর্ঘটনা, নিরাপত্তা হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ভবিষ্যতে মালাক্কার ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
হরমুজ বিশ্বকে জ্বালানিনির্ভরতার ঝুঁকি মনে করিয়ে দেয়। মালাক্কা তার চেয়েও বড় একটি সত্য সামনে আনে—বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এমন কয়েকটি সংকীর্ণ পথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

