বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালের কিছু মামলায় আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের জন্য গঠিত এই ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে তারা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংস্থাটি বলছে, অনেক মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ মূলত সাক্ষীদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দিতে একই ধরনের ভাষা বা প্রায় অভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে সেই বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে আইনের শাসন দুর্বল হতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। ওই আন্দোলনে আট শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং কয়েক হাজার মানুষের আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগের বিষয়েও ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে বলে জানানো হয়। গত ২৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করা হলেও তা আন্তর্জাতিক আদালতের সমমানের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। সংস্থাটির মতে, বর্তমান আইনে কিছু ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত জানানো, দীর্ঘ সময় আটক রাখার বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর দাবি, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ উপস্থাপনের পর দ্রুত বিচার শুরু হলে আসামিপক্ষ যথাযথ প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় নাও পেতে পারে। একই সঙ্গে অনুপস্থিত আসামিদের বিচারের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও আগের ইতিহাস:
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে। এসব মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকারই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে ওই সময়ের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা ছিল বলে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির অভিযোগ, তখন প্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনি সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
হেফাজতে ইসলামের ২০১৩ সালের আন্দোলন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলেছে, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং উপস্থাপিকা ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ভুল তথ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা আড়াল করতে সহায়তা করেছিলেন।
এইচআরডব্লিউর দাবি, সাংবাদিকদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে তাদের লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংস্থাটি এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, কয়েকটি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা সাক্ষীদের বক্তব্যে একই ধরনের ভাষা পাওয়া গেছে। এতে এসব জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেছে, ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে করা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ৫৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বক্তব্যে প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।
এ ছাড়া একই মামলায় কারাবন্দি আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিয়ে এক সরকারি কৌঁসুলির বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করার অভিযোগ ওঠার বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর ওই কৌঁসুলি পদত্যাগ করেন। তবে বিষয়টির তদন্ত শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে যে ধরনের দমন-পীড়নের সমালোচনা করা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় তার পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, অভিন্ন বা অনুলিপি করা সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচার পরিচালিত হলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

