যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। বিশেষ করে নিচু দিয়ে উড়ে আসা যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন মোকাবিলায় দেশটি এখন এমন অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে, যা দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায় এবং অল্পসংখ্যক সেনাসদস্য দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীনে তৈরি কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে পৌঁছাতে পারে। চুক্তিসংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান সর্বোচ্চ ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২৯ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। তবে চীন ও পাকিস্তান উভয় দেশই অস্ত্র সরবরাহসংক্রান্ত দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে চুক্তিটি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা
সূত্রগুলোর দাবি, প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তির মূল্য ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকা।
চুক্তির আওতায় ৩০০ থেকে ৪০০টি বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা হতে পারে। অস্ত্রগুলোর মধ্যে চীনে তৈরি কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা বলা হয়েছে।
এসব অস্ত্র মূলত স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি। একজন সেনাসদস্য কাঁধে বহন করে এগুলো নিক্ষেপ করতে পারেন। লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাপভিত্তিক নির্দেশনা ব্যবহার করে। যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার কিংবা ড্রোনের ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ অনুসরণ করে এগুলো লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি করেছে হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ঝংকিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি ইরানি ক্রেতা ও চীনা সরবরাহকারীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মূল সংস্থা বেইজিংভিত্তিক ঝং ছিং বাও শাং গ্রুপ। তবে মন্তব্যের অনুরোধ পাঠানো হলেও প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
কেন এই অস্ত্র প্রয়োজন ইরানের
গত কয়েক মাসের সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।
তবে সংঘাতের সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনাকে আধুনিক যুদ্ধবিমান ও নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের বিরুদ্ধে রক্ষা করা ইরানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান গত দুই দশকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। দূরপাল্লার আক্রমণক্ষমতায় দেশটির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও কাছাকাছি দূরত্বে এবং নিচু উচ্চতায় পরিচালিত হামলা ঠেকানোর ক্ষেত্রে এখনো কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
এই জায়গাতেই কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণত নির্দিষ্ট স্থানে বসানো থাকে। শত্রুপক্ষ অবস্থান শনাক্ত করতে পারলে দূর থেকে সেটিতে আঘাত হানতে পারে। অন্যদিকে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থান বদল করাও তুলনামূলক সহজ।
ফলে একটি প্রতিরক্ষা স্থাপনা ধ্বংস হলেও অন্য এলাকায় মোতায়েন করা দলগুলো কার্যকর থাকতে পারে। এ ধরনের অস্ত্র ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করে তুলবে না, তবে শত্রুর নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার কিংবা ড্রোনের জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কোন পথে ইরানে পৌঁছাতে পারে অস্ত্র
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে অস্ত্র পরিবহনের সম্ভাব্য পথ।
চুক্তি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী অস্ত্রগুলো পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে আকাশপথে পাকিস্তানে নেওয়া হতে পারে। এরপর পাকিস্তান হয়ে সেগুলো ইরানে পাঠানোর কথা রয়েছে।
তবে পাকিস্তান থেকে ইরানের ভেতরে অস্ত্রগুলো আকাশপথে যাবে, নাকি সড়কপথে সীমান্ত অতিক্রম করবে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।
চুক্তি বাস্তবায়িত হলে উরুমকি থেকে পাকিস্তান এবং সেখান থেকে ইরান—এই পথটি সরবরাহের মূল সংযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে চীন ও ইরান উভয় দেশের যোগাযোগ রয়েছে। তাই মানচিত্রে এই পথকে সম্ভাব্য মনে হলেও বাস্তবে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রে অনুমতি, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআর অবশ্য এ ধরনের কোনো সম্পৃক্ততার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলেছে, চীন থেকে ইরানে আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র পাঠানোর কাজে পাকিস্তান যুক্ত রয়েছে—এমন জল্পনা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। তবে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
চীনও প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্ত্রচুক্তির প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং চলমান সংঘাতের অবসানে চীন ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
চীনের এই অস্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ অস্ত্র সরবরাহের কথা স্বীকার না করলেও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, তৃতীয় দেশ কিংবা বেসরকারি বাণিজ্যিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম লেনদেনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই ওঠে।
তবে বর্তমান ঘটনায় সূত্রের দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। চুক্তি সই হয়ে থাকলেও সরবরাহের সময়, অস্ত্রের সঠিক সংখ্যা এবং পরিবহনপথ পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিজেরাই সতর্ক করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ কী ধরনের অস্ত্র
কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ হলো কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ভূমি থেকে আকাশে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এগুলো বহন করা সহজ এবং দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
এই ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত নিচু উচ্চতায় চলাচলকারী লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যেমন—
যুদ্ধবিমান, সামরিক হেলিকপ্টার, নজরদারি যান এবং আক্রমণকারী ড্রোন।
কিউডব্লিউ-১২ ব্যবস্থার একটি পরীক্ষা ২০২২ সালের শুরুর দিকে উত্তর চীনে চালানো হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় আক্রমণকারী হেলিকপ্টারের অনুকরণে তৈরি একটি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কিউডব্লিউ-১২ তুলনামূলক পুরোনো ও কম সক্ষম ব্যবস্থা। কিউডব্লিউ-১৮ এবং কিউডব্লিউ-১৯-এর মতো পরবর্তী সংস্করণগুলোকে সাধারণত আরও উন্নত বলে বিবেচনা করা হয়।
তারপরও কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ সম্পূর্ণ অকার্যকর নয়। বিশেষ করে ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং নিচু উচ্চতায় আসা বিমানের বিরুদ্ধে এগুলো স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষার একটি অতিরিক্ত স্তর তৈরি করতে পারে।
ইরানের মতো বড় ভূখণ্ডের দেশে শত শত বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, তেল ও গ্যাস অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার আশপাশে মোতায়েন করা সম্ভব।
তবে এ ধরনের অস্ত্র উচ্চতায় উড়ে যাওয়া বিমান, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা অত্যাধুনিক আকাশ হামলার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা দিতে পারবে না। তাই এগুলোকে বড় আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
আরও উন্নত সংস্করণেও আগ্রহ
ইউরোপের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তাদের দেশের কর্তৃপক্ষ ইরানের কাছে কিউডব্লিউ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাধীন কয়েকটি প্রস্তাব সম্পর্কে অবগত।
এসব আলোচনায় কিউডব্লিউ-১২, কিউডব্লিউ-১৮ এবং কিউডব্লিউ-১৯ ব্যবস্থা রয়েছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি নিরাপত্তা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান কিউডব্লিউ-১২ এবং কিউডব্লিউ-১৮ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চেষ্টা করছিল। তবে কোনো চুক্তি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ওই সূত্র নিশ্চিত নয়।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ইরানের আগ্রহ শুধু একটি নির্দিষ্ট অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি সম্ভবত বিভিন্ন সক্ষমতার বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করে বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে চাইছে।
স্থলপথ ব্যবহারের সম্ভাবনা কেন দেখা হচ্ছে
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার দুটি সূত্র এবং একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান চীনের সামরিক সরঞ্জাম এবং সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য উপাদান পরিবহনের জন্য স্থলপথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করেছে।
এর পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে।
প্রথমত, সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের বিষয়টি আরও গোপন রাখা। বড় আকারের আকাশ কিংবা সমুদ্র পরিবহন আন্তর্জাতিক নজরদারিতে দ্রুত ধরা পড়তে পারে। তুলনামূলকভাবে ছোট চালানে স্থলপথ ব্যবহার করলে সরবরাহের প্রকৃত ধরন শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট পরিবহনপথে সমস্যা হলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা। নিষেধাজ্ঞা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি কিংবা রাজনৈতিক চাপের কারণে কোনো পথ বন্ধ হয়ে গেলে স্থলভিত্তিক বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাগুলো সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে আলোচিত হয়েছে। বাস্তবে কোন পথ ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
সংঘাত বন্ধ হয়নি, রয়েছে নতুন হামলার আশঙ্কা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার দুই সপ্তাহ ধরে চলা বোমা হামলা আকস্মিকভাবে স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, আলোচনার মাধ্যমে পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতের সমাধান না হলে হামলা আবার শুরু হতে পারে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে এপ্রিল থেকে সংঘাতটি যুদ্ধবিরতি অবস্থায় রয়েছে।
এই অনিশ্চয়তাই ইরানের দ্রুত অস্ত্র সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ যুদ্ধবিরতি থাকলেও ভবিষ্যতে হামলা পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা দেশটির জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
ইরান হয়তো ধরে নিচ্ছে, পরবর্তী দফার সংঘাতে প্রতিপক্ষ আবারও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রাডার, বিমানঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। সে কারণে অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
চীন–ইরান সামরিক সম্পর্কের নতুন ইঙ্গিত
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে ইরানের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে দেশটির সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাবে।
চীন ও ইরানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আগে থেকেই রয়েছে। তবে বড় আকারে আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র সরবরাহের ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিষয়টিকে শুধু একটি অস্ত্র কেনাবেচার ঘটনা হিসেবে দেখবে না। তারা এটিকে ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্রভাব বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নাম সম্ভাব্য পরিবহনপথে যুক্ত হওয়ায় দেশটির ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। যদিও পাকিস্তান এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা
বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট আমদানিতে বিধিনিষেধের মুখে রয়েছে ইরান। এ অবস্থায় দেশটি একদিকে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন করছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অস্ত্রের জন্য বিদেশি উৎস খুঁজছে।
চীনা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কেনার উদ্যোগ সেই দ্বিমুখী কৌশলেরই প্রতিফলন। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশি অস্ত্র সংগ্রহ ইরানের জন্য তুলনামূলক সহজ সমাধান হতে পারে।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীনের কাছ থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য পৃথক একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল ইরান। ওই আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান ইরানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০টি এবং চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলার।
অস্ত্রগুলো পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে আকাশপথে পাকিস্তানে এবং সেখান থেকে ইরানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তবে পাকিস্তান ও চীন উভয় দেশই প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ফলে বিষয়টি এখনো নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন অস্ত্র সরবরাহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে ইরানের প্রতিরক্ষা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য একটি পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত।
চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি নতুন স্তর যোগ করবে। তবে কয়েকশ বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই দেশটির সব প্রতিরক্ষা দুর্বলতা দূর হবে না। এগুলো মূলত নিচু দিয়ে আসা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সম্ভাব্য চুক্তি চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানের উদ্বেগকে প্রকাশ করছে। যুদ্ধবিরতি থাকলেও দেশটি যে নতুন হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না এবং দ্রুত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে চাইছে, এই উদ্যোগ তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।

