যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুযায়ী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত বলে মনে করেন দেশটির প্রায় অর্ধেক নাগরিক। একই সময়ে ইসরায়েলের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্যও সামনে এসেছে, যা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইকোনমিস্ট/ইউগভ পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ বলেছেন, আইসিসির পরোয়ানার ভিত্তিতে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা উচিত। বিপরীতে ২৭ শতাংশ এই মতের বিরোধিতা করেছেন। আর ২৩ শতাংশ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা হ্যারিসকে ভোট দেওয়া নাগরিকদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তারের পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও ২৩ শতাংশ একই অবস্থান নিয়েছেন। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
গাজা যুদ্ধকে ঘিরে মার্কিন জনমতের পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে জরিপের অন্যান্য ফলাফলেও। অংশগ্রহণকারীদের ৪৭ শতাংশ মনে করেন, গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য নেতানিয়াহুকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। বিপরীতে ২৪ শতাংশ এই মতের সঙ্গে একমত নন। একই সংখ্যক মানুষ মনে করেন, তার নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সম্পর্কও চাপে পড়েছে।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করেন যে গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ২৪ শতাংশ। রাজনৈতিক বিভাজন এখানেও স্পষ্ট। কমলা হ্যারিসের সমর্থকদের ৭২ শতাংশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে দেখলেও ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে এ হার ২২ শতাংশ।
গত ২৫ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ১,৫৫৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের ওপর এই জরিপ পরিচালিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন ধরে রাখতে দেশটির সরকার ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, এ উদ্দেশ্যে ব্র্যাড পারস্কেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ক্লক টাওয়ার এক্স-এর সঙ্গে ৪৬.৫ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করা হয়। পারস্কেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সাবেক ব্যবস্থাপক ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবায় ইসরায়েল-সংক্রান্ত তথ্যপ্রবাহকে প্রভাবিত করা। এ লক্ষ্যে তারা ১০টি ওয়েবসাইট তৈরি করে, যেগুলো নিজেদের সংবাদ, গবেষণা কিংবা তথ্য যাচাইয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে। এসব ওয়েবসাইটে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয় এবং গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের বিপরীত অবস্থান প্রচার করা হয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল এমন বিপুল পরিমাণ অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করা, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন চ্যাটবট ভবিষ্যতে সেই তথ্য ব্যবহার করে উত্তর দিতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাইক্রোসফট কোপাইলট, গুগল জেমিনাই এবং পারপ্লেক্সিটি-র মতো এআই প্ল্যাটফর্মও এসব ওয়েবসাইটের তথ্য উদ্ধৃত করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীদের জানানো হয়নি যে এসব তথ্য ইসরায়েলি সরকারের অর্থায়নে তৈরি উৎস থেকে এসেছে।
এছাড়া এসব ওয়েবসাইটের তথ্য বৃহৎ অনলাইন ডেটা আর্কাইভেও যুক্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রত্যাশিতভাবে বদলানো সম্ভব হয়নি। বরং জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত করছে, গাজা যুদ্ধ ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ আগের তুলনায় আরও সমালোচনামুখর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল তথ্যযুদ্ধ বা প্রচারণার প্রশ্ন নয়; বরং বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন।
ফলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চললেও, গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক জনমত এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থান ভবিষ্যতে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

