দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছিল—কীভাবে কিউবা, ইরান বা অন্যান্য মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা যায়। কখনো কোনো দেশের পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা, কখনো আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা, আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ উন্মুক্ত রাখার মতো লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এর অন্যতম উদাহরণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই নৌপথে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ইরানের মতো দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই পথ খোলা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি।
তবে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানোর কৌশল অনুসরণ করেছে। ধারণা ছিল, সীমিত সামরিক অভিযান, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপ একসঙ্গে প্রয়োগ করলে প্রতিপক্ষ একসময় দুর্বল হয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই কৌশল সব সময় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রে তাকেহ দেখিয়েছেন, ধীরে ধীরে সামরিক চাপ বাড়ানোর এই নীতি অতীতে বহুবার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। তার মতে, ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ওয়াশিংটন প্রতিপক্ষের মানসিকতা ও সহ্যক্ষমতা সম্পর্কে ভুল হিসাব করেছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: চাপ প্রয়োগের পুরোনো শিক্ষা
ধাপে ধাপে সামরিক চাপ প্রয়োগের ধারণার বড় পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধে। সে সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারা এবং তার নীতিনির্ধারক দল মনে করেছিলেন, উত্তর ভিয়েতনামের ওপর সামরিক চাপ ক্রমাগত বাড়ানো হলে দেশটির নেতৃত্ব বুঝতে পারবে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সমঝোতায় আসাই তাদের জন্য ভালো।
ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনায় বসবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল এর উল্টো।
উত্তর ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। বোমা হামলা দেশটির সরকারকে দুর্বল করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও শক্তিশালী করে।
ফলে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এত বিপুল পরিমাণ বোমা ব্যবহার করেছিল যে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ আগের বহু যুদ্ধের সম্মিলিত ব্যবহারের চেয়েও বেশি ছিল। এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ ভিয়েতনামি নিহত হন।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, সামরিক শক্তির মাধ্যমে কোনো দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দেওয়া সব সময় সম্ভব নয়।
ইরান যুদ্ধের পেছনে ভুল হিসাব?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে। তার প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে একাধিক ধরনের বক্তব্য এসেছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, দুটি ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্রুত সাফল্যের বিষয়ে আশাবাদী করে তুলেছিল।
এর একটি ছিল ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযান। অন্যটি ছিল ইরানের অভ্যন্তরে শুরু হওয়া গণ-অভ্যুত্থান, যা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছিল।
কিন্তু ইরানের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে নানা অভ্যন্তরীণ সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাইরের অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণার চেয়ে বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে হত্যা করে। অনেকের ধারণা ছিল, এতে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দ্রুত নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। একই সঙ্গে তারা যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরে জনগণের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করে।
পারস্য উপসাগরে পাল্টা চাপ
ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নেয়।
দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর আঘাত হানে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালে শুধু একটি দেশের ওপর নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে।
এটাই ছিল ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত হাতিয়ার। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় বাস্তবতা হলো—এখানে শুধু সামরিক সক্ষমতা নয়, ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব পক্ষ মনে করে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তারা অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রাখে।
অনিশ্চয়তার কৌশল এবং নতুন ঝুঁকি
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অনিশ্চয়তা। কখনো সামরিক অভিযান বন্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো আকস্মিকভাবে নতুন হামলার হুমকি এসেছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ভেতরে বা আশপাশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—যেমন সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র—ধ্বংস করতে পারে।
তবে এ ধরনের হামলার ফল কী হতে পারে, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ইরানের জনগণ এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট, খাদ্যঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মতো সমস্যার মুখোমুখি।
নতুন হামলা হলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হবে।
এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় আকারের হামলা চালাতে পারে। তখন সংঘাত একটি দীর্ঘমেয়াদি পাল্টাপাল্টি আক্রমণের চক্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মানবিক সংকট বাড়ে
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পার্থক্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
পারস্য উপসাগরের গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক। বিশ্বের বড় একটি অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই অঞ্চলের নিরাপদ নৌ চলাচলের ওপর নির্ভরশীল।
তাই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। এ কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অনুমোদনে বহুজাতিক উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে মত রয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন ঐতিহ্যগত বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক জোটের ওপর তুলনামূলক কম আস্থা রাখে। ফলে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, অদূর ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বড় দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকেই বহন করতে হতে পারে।
ইতিহাসের সতর্কবার্তা
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়া শুরু করা যুদ্ধের প্রভাব বহু বছর ধরে থেকে যায়। যুদ্ধ শুরু করা নেতারা ক্ষমতা ছেড়ে চলে গেলেও সেই সংঘাতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য বহন করতে হয় পরবর্তী প্রজন্মকে।
১৯৬৪ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার আগে মার্কিন কূটনীতিক জর্জ বল প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, “একবার বাঘের পিঠে চড়ে বসলে কখন এবং কীভাবে নামা যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।”
রে তাকেহর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই একই ধরনের ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা অনেক সময় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখান থেকে বের হয়ে আসা শুরু করার চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে।

