গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির নতুন উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরদার হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে না। কূটনৈতিক তৎপরতা চলার মধ্যেই আবারও বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে অন্তত আটজন ফিলিস্তিনির প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, আলোচনার টেবিলে অগ্রগতির কথা শোনা গেলেও মাঠের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল।
স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট ২০২৬ গাজার বিভিন্ন স্থানে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। দেইর আল-বালাহর দক্ষিণে একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে একজন নারী ও একজন পুরুষ নিহত হন। একই সময়ে খান ইউনিসে পৃথক হামলায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গাজা শহরের পুরোনো এলাকায় আরেকটি হামলায় একজন নিহত হন। অন্যান্য এলাকায়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে।
এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত শান্তি বোর্ড গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার লক্ষ্যে ১৫ দফার একটি রূপরেখা প্রকাশ করে। ওই পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে সংঘাত কমানো, গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ওই পরিকল্পনার কোনো ধাপই কার্যকর হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতার ঘোষণা যত সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন।
হামাস জানিয়েছে, গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী যদি ইসরাইল সামরিক অভিযান বন্ধ করে এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে, তাহলে তারা অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তরের বিষয়ে এগোতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ইসরাইলের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, হামাসের পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।
এই দুই বিপরীত অবস্থানই আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। এক পক্ষ আগে হামলা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে, অন্য পক্ষ আগে নিরস্ত্রীকরণের শর্ত দিচ্ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির পথ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দেশটির কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পরিকল্পনাটিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা উচিত।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত ফাতাহর সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ দাহলান দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার তাকে জানিয়েছেন যে গাজায় হামলা বন্ধের লক্ষ্যে ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিদিনের সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয় কি না তার ওপর।
এর মধ্যেই শনিবার মধ্য গাজার একটি চিকিৎসাসামগ্রীর গুদামে হামলার ঘটনা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হামলায় গুদামটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং সেখানে প্রায় ২০ মিটার চওড়া ও ১০ মিটার গভীর গর্ত তৈরি হয়। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর এমন হামলা ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবা ও জরুরি ত্রাণ বিতরণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেই সংঘাত বন্ধ হয় না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হলে উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম আস্থার পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরি। কিন্তু এখনো সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে আলোচনার পাশাপাশি সামরিক অভিযান চলতে থাকায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে গাজার পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। একদিকে আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন হামলা ও প্রাণহানির খবর সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়, বাস্তবে হামলা বন্ধ এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

