পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বাকডোকরা খাল খনন প্রকল্পকে ঘিরে ব্যয়, কাজের মান এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের সঙ্গে বাস্তব কাজের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম কাজ হয়েছে, কোথাও আবার বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। এসব অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং আপাতত প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে চলতি বছরের ৮ মে বাকডোকরা কুলাডাঙ্গী সেতু থেকে পশ্চিমে আব্বাস আলীর জমি পর্যন্ত ৬০৫ মিটার খাল খননের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পে দুটি কালভার্ট নির্মাণ, আরসিসি পাইপ বসানো, ঘাস ও গাছ লাগানোসহ মোট ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শ্রমিক দিয়ে খাল খননে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা, এক্সকাভেটর ব্যবহারে ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আরসিসি পাইপ স্থাপনে ৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কালভার্ট নির্মাণে প্রথমে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা, ঘাস লাগাতে ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা এবং গাছ রোপণে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ ছিল। পরে দুটি কালভার্ট নির্মাণের ব্যয় বাড়িয়ে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, কাগজে-কলমে যে কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে তার অনেকটাই মিলছে না। প্রকল্পে ১ হাজার ১৫৪টি গাছ লাগানোর কথা থাকলেও সরেজমিনে প্রায় ৬৮০টি গাছ দেখা গেছে। এতে গড়ে প্রতিটি গাছের পেছনে প্রায় ৬৭৯ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
আরসিসি রিং পাইপের ক্ষেত্রেও ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পে ১৯৬টি পাইপ বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে ২২টি স্থানে মাত্র ৪৮টি পাইপ স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতিটি পাইপের মূল্য প্রায় ২ হাজার টাকা হলেও প্রকল্পে প্রতিটির জন্য ১৩ হাজার ৪৭৯ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এছাড়া ১১৯ জন শ্রমিককে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়ার পরও ঘাস লাগানোর জন্য আলাদা করে ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ বিষয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের কালভার্ট নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় পরে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলেও নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যেখানে ১৬ মিলিমিটার রড ব্যবহারের কথা ছিল সেখানে ১২ মিলিমিটার রড ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজে মাটি ও ভাঙা ইট মেশানো নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খালের নকশা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সংশ্লিষ্ট স্থানে আগে কোনো খাল ছিল না। পরে নথিতে সেটিকে খাল হিসেবে দেখিয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আবার শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও অধিকাংশ মাটি কাটা হয়েছে এক্সকাভেটর দিয়ে। পরে কিছু শ্রমিক দিয়ে সীমিত কাজ করিয়ে প্রকল্প সম্পন্ন দেখানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, খনন করা মাটি তাদের জমিতে ফেলে রাখায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মতে, খালটি এলাকার পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাত সদস্যের কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তাদের মতামত নেওয়া হয়নি এবং প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা অবগত নন। এমনকি বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা।
কমিটির সদস্য ময়না বেগম বলেন, তাকে না জানিয়েই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমিক দিয়ে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ কাজ হয়েছে যন্ত্র দিয়ে। অপরদিকে প্রকল্পের সভাপতি করুনা রানী পাল জানান, ব্যক্তিগত কারণে তিনি এলাকার বাইরে ছিলেন। প্রয়োজনীয় কিছু নথিতে স্বাক্ষর করলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সম্পর্কে তার বিস্তারিত জানা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, তিনি নিয়ম মেনেই কাজ পরিচালনা করেছেন। কালভার্ট নির্মাণে একবার নিম্নমানের খোয়া আনা হয়েছিল, পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের নির্ধারিত কাজ শেষ হয়েছে এবং তাদের পারিশ্রমিকও পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্তের কারণে কাজ স্থগিত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামণি দেবী জানিয়েছেন, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

