বিশ্বব্যাপী দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতি আগামী বছরগুলোর খাদ্যনিরাপত্তাকে নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বের আরও প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। বর্তমানে যেসব দেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি আগে থেকেই দুর্বল, সেখানেই এ চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ৪৫টি দেশে প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে। এল নিনোর কারণে এই সংখ্যার সঙ্গে আরও এক-পঞ্চমাংশের বেশি মানুষ যুক্ত হতে পারে। যদিও এবারের আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাব প্রথম দিকের কিছু পূর্বাভাসের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবু সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং কৃষকদের আয় ও খাদ্যসংস্থান দুটিই চাপের মুখে পড়বে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যা কয়েক বছর পরপর দেখা দেয়। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে দেয়। কোথাও দীর্ঘ খরা সৃষ্টি হয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। চলতি বছরের এল নিনোকে গত কয়েক দশকের অন্যতম শক্তিশালী বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। অনেকে একে ‘সুপার এল নিনো’ বললেও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে। শক্তিশালী এল নিনো এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা একসঙ্গে কাজ করলে ২০২৬ বা ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি হতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, সেচের চাহিদা বাড়ে এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম আগেই চাপের মধ্যে ছিল। নতুন আবহাওয়া ঝুঁকি সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে শস্য, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে।
সংস্থাটি এবার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতিমূলক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত ৮ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগেভাগে খাদ্য, নগদ সহায়তা ও কৃষি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে খাদ্যসংকটের প্রভাব সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের মজুদ শেষ হতে এবং বাজারে সরবরাহ কমে যেতে একাধিক মৌসুম সময় লাগে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান চাষাবাদের মৌসুম চলবে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু সবচেয়ে বড় চাপ দেখা দিতে পারে ফসল কাটার কয়েক মাস পরে, যখন পরিবারগুলোর নিজস্ব খাদ্যভাণ্ডার কমে আসবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জলবায়ু ও সহনশীলতা বিভাগের পরিচালক রিচার্ড চুলারটন জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় সবচেয়ে বড় প্রভাব ২০২৭-২৮ সালের খাদ্যসংকটের মৌসুমে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতির পূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব কিছুটা দেরিতে প্রকাশ পাবে।
খাদ্যনিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ-মার্টিন বাওয়ারের মতে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক খাদ্যদাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় বিশ্বে প্রায় ৬ থেকে ১০ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগাম প্রস্তুতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির আশা, আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তবে আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি। অর্থের অভাবে অনেক এলাকায় পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম কমে গেছে। এতে প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ৪৫টি দেশের বাইরেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে খাদ্যদাম বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এটি অনেকটাই নির্ভর করবে প্রধান খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলো উৎপাদন, মজুদ ও রফতানি নীতিতে কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। অতীতে দেখা গেছে, সংকটের সময় রফতানি সীমিত করলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাজ্যের কৃষকরাও অতিরিক্ত গরম ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। খুচরা বিক্রেতারা সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। ফলে এল নিনোর প্রভাব শুধু দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা ও বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগাম প্রস্তুতি, কৃষি সহায়তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা। সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।

