বিশ্ব অর্থনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ছোট পরিসরের কার্যকর জোট গড়ে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বড় মুসলিম সহযোগিতা কাঠামো এখনো সেই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের একটি পুরোনো প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিয়াকো পরিকল্পনা ভবিষ্যতে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৬ সালের ২২ জুন মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উপস্থিতিতে দুই দেশের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক বিনিময় করেন।
ওই বৈঠকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগী হওয়ার প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিও সমর্থন জানায়।
অনেকের কাছে এটি ছিল শুধুই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বিষয়টি আরও বড় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হতে পারে।
কারণ, বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সিয়াকো পরিকল্পনার মূল ধারণাই হলো—ছোট কিন্তু কার্যকর একটি আঞ্চলিক জোট তৈরি করা, যা ধীরে ধীরে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক সহযোগিতার বড় চ্যালেঞ্জ
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশ সংখ্যা ৫৭টি। এসব দেশে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ এবং বড় কয়েকটি সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে এসব দেশের হাতে।
এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা গত দুই দশক ধরে নিজেদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের দশ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল যে, সদস্য দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ নিজেদের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৪৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশেরও কম।
অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এখনো অর্জিত হয়নি এবং গত এক দশকেও বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অনেকে মনে করেন, এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সমস্যাটি শুধু ইচ্ছার নয়; বরং পদ্ধতির।
৫৭টি দেশকে একসঙ্গে একই অর্থনৈতিক কাঠামোয় নিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এসব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শুল্ক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং উন্নয়নের স্তর একে অপরের থেকে অনেক আলাদা।
ফলে বড় পরিসরের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও বাস্তবে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ছোট জোট থেকেই বড় সাফল্যের উদাহরণ
বিশ্বের সফল অর্থনৈতিক জোটগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় সব বড় উদ্যোগই ছোট পরিসর থেকে শুরু হয়েছে।
ইউরোপের অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুরু হয়েছিল মাত্র ছয়টি দেশ এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সহযোগিতা কাঠামোও শুরু হয়েছিল পাঁচটি দেশ নিয়ে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ গঠিত হয়েছিল ছয়টি দেশ নিয়ে।
কোনো জোটই শুরুতে পুরো একটি অঞ্চলকে একসঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেনি। বরং তারা প্রথমে এমন দেশগুলোকে একত্র করেছে যাদের মধ্যে বাস্তব বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশের সিয়াকো পরিকল্পনার ভিত্তিও অনেকটা একই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সিয়াকো পরিকল্পনার মূল ধারণা কী?
সিয়াকো মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা।
এই পরিকল্পনায় রয়েছে বাংলাদেশ, ব্রুনেই দারুসসালাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং মালদ্বীপ।
এই পাঁচটি দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত। বঙ্গোপসাগর থেকে আন্দামান সাগর, মালাক্কা প্রণালি হয়ে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেশি।
এই দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের মিন্দানাও এবং ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করলে সম্ভাব্য বাজারের আকার ৪০০ মিলিয়নের বেশি হতে পারে বলে সিয়াকো ফাউন্ডেশনের ধারণা।
এটি মুসলিম বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর সমান একটি বড় ভোক্তা বাজার তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু জনসংখ্যার আকারই এই উদ্যোগের মূল শক্তি নয়। বরং সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য।
একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, হতে পারে পরিপূরক
আঞ্চলিক বাণিজ্য সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতার পার্থক্য।
যেসব দেশ একই ধরনের পণ্য উৎপাদন করে এবং একই বাজারে প্রতিযোগিতা করে, তাদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির সুফল অনেক সময় সীমিত থাকে।
কিন্তু সিয়াকোর প্রস্তাবিত দেশগুলোর অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
বাংলাদেশের রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ উৎপাদন, শ্রমনির্ভর শিল্প এবং তরুণ কর্মশক্তি।
ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে বড় বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শক্তিশালী শিল্পভিত্তি।
মালয়েশিয়া এগিয়ে রয়েছে উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং ইসলামি অর্থনীতির ক্ষেত্রে।
ব্রুনেইয়ের রয়েছে জ্বালানি সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা।
মালদ্বীপ পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
এই বৈচিত্র্যই সিয়াকো উদ্যোগকে অন্য অনেক আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিকল্পনা থেকে আলাদা করে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র
সিয়াকো কার্যকর হলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং হালাল পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার আরও উন্মুক্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা বাংলাদেশের উৎপাদন খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তৃতীয়ত, সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। বঙ্গোপসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
তবে শুধু পরিকল্পনা করলেই সিয়াকো সফল হবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক উদ্যোগ, বাণিজ্য নীতি সমন্বয় এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাস্তব সহযোগিতা।
শুল্ক কমানো, বিনিয়োগ সহজ করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এছাড়া দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ভিন্ন হওয়ায় সমন্বয় করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
তবে ইতিহাস বলে, ছোট পরিসরের কার্যকর উদ্যোগ থেকেই বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশ যদি সিয়াকো পরিকল্পনাকে বাস্তব কাঠামোতে রূপ দিতে পারে, তাহলে এটি শুধু দেশের জন্য নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি নতুন মডেল হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি বড় বড় শক্তির প্রতিযোগিতা, সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং নতুন আঞ্চলিক জোটের দিকে এগোচ্ছে। এই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি কার্যকর বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলে তা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
সিয়াকো এখনো একটি ধারণা মাত্র, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ।

