যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসননীতির ধারাবাহিকতায় দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর এখন পর্যন্ত এক লাখ পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। শুধু তা-ই নয়, আরও হাজারো মানুষের ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত নানা সুযোগ-সুবিধাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক তথ্যবিবরণীতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিজেই এসব তথ্য জানিয়েছে।
দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, ভিসার শর্ত ভঙ্গ, জালিয়াতি, সহিংসতায় উসকানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা—এসবই মূলত ভিসা বাতিলের পেছনের প্রধান কারণ। বর্তমান প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসন অভিবাসন ঠেকাতে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে আসছে, যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বহু অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে—তাদের একটি বড় অংশের কাছে বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও। সাম্প্রতিক এই বিপুল সংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনা প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতিরই আরেকটি নতুন দিক সামনে নিয়ে এল।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব ভিসা বাতিল করা হয়েছে নিয়মিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ভিসাধারীরা শর্ত মেনে চলছেন কি না এবং তাঁরা দেশটির সাধারণ নাগরিকদের জন্য কোনোভাবে ঝুঁকি তৈরি করছেন কি না, তা নিশ্চিত করা। হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধও এই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে বেশ কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে রয়েছে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ, আরেকজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানব পাচারের অভিযোগ, এবং অন্য একজনের বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ আনা হয়েছে।
তথ্যবিবরণীতে আরও জানানো হয়, উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস এমন শতাধিক বাবা-মায়ের ভিসা বাতিল করেছে, যাঁরা সন্তানের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সন্তান প্রসবের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া একজন পরিচিত রক্ষণশীল অধিকারকর্মীকে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের ভিসাও বাতিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেছিলেন, যা দপ্তরের দৃষ্টিতে সহিংসতাকে উৎসাহিত করার শামিল বলে বিবেচিত হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন—এমন বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। দপ্তরের ভাষ্যে, ভিসা কোনো অধিকার নয়, বরং একটি সুযোগমাত্র, এবং এই সুযোগের অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সব আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরের শুরুর দিকেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক লাখের বেশি ভিসা বাতিলের তথ্য জানিয়েছিল, যা সে সময় রেকর্ডসংখ্যক বলে বিবেচিত হয়েছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে এখন পৌনে দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা অভিবাসননীতির কঠোরতা কতটা দ্রুত বাড়ছে, তারই একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
নতুন ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোরতা অনুসরণ করছে বর্তমান প্রশাসন। আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে, এবং সামগ্রিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার পরিধিও আগের তুলনায় অনেক বাড়ানো হয়েছে।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের ব্যাপক নজরদারিমূলক পদক্ষেপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং অভিবাসীদের অতিরিক্তভাবে চিহ্নিত ও পৃথকীকরণের প্রবণতাকেও উসকে দিতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

