ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার দাবি করলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন সেনাদের হাতে।
বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কথা জানানো হয়েছে।
মার্কিন যৌথ বাহিনীর ঘাঁটি অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি ভালোভাবেই এগোচ্ছে এবং আলোচনা নিয়েও তিনি আশাবাদী। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইরান বর্তমানে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করছে না।
ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, দেশের স্বার্থে নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে এবং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালোভাবে এগোচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সমুদ্রপথে নতুন করে হামলা ও সামরিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ফলে হরমুজ প্রণালির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে জাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এবং ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজকে ঘিরে পৃথক সামরিক ঘটনার খবর পাওয়া যায়।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে মিসরীয় মালিকানাধীন পণ্যবাহী জাহাজ তিহামাহ সন্দেহভাজন হুতি হামলার শিকার হয়েছে। এতে চার নাবিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি এবং একজন ইন্দোনেশীয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুতিদের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
হুতি নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা সাবার দাবি, তিহামাহ জাহাজটি সৌদি আরবের জন্য সামরিক সরঞ্জাম বহন করছিল। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় ওমান সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজেও মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ অমান্য করছিল এবং বারবার সতর্ক করার পরও থামেনি।
পরে একটি মার্কিন নৌ হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে জাহাজটির দিক পরিবর্তনের ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নিলে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া বক্তব্যে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি লেবানন, গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করার শর্তও মেনে নিতে হবে।
এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে বলে তিনি জানান।
ফলে একদিকে ট্রাম্প যখন দাবি করছেন, প্রণালিটির পুরো নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, অন্যদিকে ইরান বলছে তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলবে না। দুই পক্ষের এই বিপরীত অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও দরপতন দেখা গেছে।
এর মূল কারণগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চিত্র পাওয়া যায় জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যানে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে। অথচ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন সাধারণত ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—ট্রাম্পের এই দাবি নিঃসন্দেহে সংঘাতের সামরিক দিককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ থাকা এবং ইরানের পক্ষ থেকে এটি খোলার জন্য একাধিক শর্ত দেওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পারছে। কারণ একটি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ শুধু সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; সেখানে নিরাপদ ও নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে ফিরবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর উদ্যোগের ওপর।
এর মধ্যে যদি জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। আর সেই উদ্বেগের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যেতে পারে তেলের দাম ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।

