আকাশে ঘটতে যাচ্ছে বিরল এক মহাজাগতিক দৃশ্য। আজ বুধবার (১২ আগস্ট ২০২৬) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা। এ সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর্যন্ত সূর্যের আলো সম্পূর্ণ আড়ালে থাকবে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সব সময় দেখা যায় না। তাই এবারের ঘটনাটি ঘিরে ইতোমধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি আকাশপ্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের বিশেষত্ব হলো—ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকেও এটি দেখা যাবে। ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে এমন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ আর দেখা যায়নি। ফলে এবারের গ্রহণকে ইউরোপের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য মহাজাগতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যেসব অঞ্চল থেকে দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস
এবারের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের প্রধান পথ বা ‘পূর্ণগ্রাসের পথ’-এর আওতায় রয়েছে স্পেন, আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা এবং রাশিয়া ও পর্তুগালের কিছু অংশ।
এর মধ্যে স্পেনের বেশ কয়েকটি অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে। উত্তর ও পূর্ব স্পেনের লিওন, ভায়াদোলিদ, জারাগোজা, তেরুয়েল ও ভ্যালেন্সিয়া শহর পূর্ণগ্রাসের সরাসরি পথের মধ্যে রয়েছে।
স্পেনে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৭ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে। স্থানভেদে সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ সেকেন্ড পর্যন্ত সূর্য পুরোপুরি ঢেকে থাকতে পারে।
স্পেনের বড় শহর মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা পূর্ণগ্রাসের মূল পথের বাইরে থাকবে। তবে এসব শহর থেকেও সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ ঢাকা পড়া দেখা যাবে।
আংশিক সূর্যগ্রহণও দেখা যাবে বহু জায়গা থেকে
শুধু পূর্ণগ্রাসের পথের মানুষই নয়, বিশ্বের বিশাল একটি অংশের মানুষ এবারের গ্রহণ আংশিকভাবে দেখতে পারবেন। পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার কিছু এলাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছোট অংশ থেকে সূর্যের আংশিক ঢাকা পড়ার দৃশ্য দেখা যাবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আংশিকভাবে হলেও এই সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পেতে পারেন প্রায় ৯৮ কোটি মানুষ।
অর্থাৎ পূর্ণগ্রাসের সরাসরি পথ তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ হলেও আংশিক গ্রহণের দৃশ্য অনেক বিস্তৃত অঞ্চল থেকে দেখা যাবে।
কেন হয় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ?
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এমন অবস্থানে চলে আসে যে চাঁদের ছায়া পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অংশের ওপর পড়ে এবং সেখান থেকে সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদকে আকাশে প্রায় একই আকারের দেখানোর কারণেই এমন অসাধারণ দৃশ্য সম্ভব হয়। যদিও সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বড়, সেটি পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় আকাশে দুটির আপাত আকার প্রায় কাছাকাছি মনে হয়।
চাঁদ যখন সূর্যের সামনে চলে আসে, তখন নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ সূর্যের উজ্জ্বল অংশ সম্পূর্ণ ঢাকা পড়তে দেখেন। সেই সময় দিনের আলোও হঠাৎ অনেকটা কমে গিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশে অস্বাভাবিক অন্ধকার নেমে আসতে পারে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ কতটা বিরল?
প্রতি বছর পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি সূর্যগ্রহণ ঘটে। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে আংশিক, বলয়গ্রাস, পূর্ণগ্রাস কিংবা সংকর ধরনের গ্রহণ।
তবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অনেক বিরল। পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এটি দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। বৈশ্বিক হিসাবে শতাব্দীতে গড়ে প্রায় ৬৬ বার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে, অর্থাৎ গড়ে প্রায় দেড় বছরে একবার পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে এমন ঘটনা ঘটে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ একই দেশ বা একই শহর থেকে দেখা যায় না। পূর্ণগ্রাসের পথ সাধারণত পৃথিবীর একটি সরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে একই দেশের এক এলাকা থেকে পূর্ণগ্রাস দেখা গেলেও অন্য এলাকা থেকে সেটি কেবল আংশিক দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের আকাশে কি দেখা যাবে?
এবারের পূর্ণগ্রাসের মূল পথ ইউরোপ, উত্তর আটলান্টিক অঞ্চল ও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ নেই। ফলে বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীদের জন্য এবারের গ্রহণ মূলত বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি সম্প্রচার বা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুসরণ করার বিষয় হয়ে থাকবে।
তবে মহাজাগতিক এই ঘটনার গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্যও কম নয়। সূর্যগ্রহণ নিয়ে মানুষের আগ্রহের পাশাপাশি এটি বিজ্ঞান শিক্ষা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কৌতূহল বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ।

