অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) কার্যকরের উদ্যোগের পর এবার জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকাতে কঠোর আইন এবং জমি কেনাবেচায় নতুন বিধিনিষেধ আনার ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
গতকাল মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাঁকুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের এক পর্যালোচনা সভায় তিনি জানান, দুটি আইন প্রণয়নের কাজ করছে রাজ্য সরকার। এর একটি ধর্মান্তর সংক্রান্ত এবং অন্যটি জমি কেনাবেচার বিষয়ে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনব। এক দেশ, এক আইন। এরপর জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকাতে কঠোর আইন করা হবে। একই সঙ্গে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনা হবে।’
তবে প্রস্তাবিত ভূমি আইনে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, তা স্পষ্ট করেননি মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে জমি বা সম্পত্তি কেনাবেচায় সরাসরি কোনো বাধা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে ধর্মান্তর এবং ‘জমি দখলের অভিযান’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুপ্রবেশের কারণে জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে যাচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষ জমি হারাচ্ছেন বলেও দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়ে আসছে। এবার সেই রাজনৈতিক বক্তব্যই রাজ্য সরকারের নীতিনির্ধারণের অংশ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের সভায় বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বীরভূমসহ বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্য, বিধায়ক, মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক এবং প্রায় ৭৫ জন বিডিও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু সংগঠন বাঁকুড়া ও জঙ্গলমহলের দরিদ্র মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। এসব সংগঠন অবৈধ ধর্মান্তর এবং মৌলবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিজ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তার দাবি, সীমান্তবর্তী জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, অবৈধ ওবিসি তালিকা বাতিল করা হয়েছে, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা বন্ধ করা হয়েছে এবং মহররমের সময় তলোয়ার বহন ঠেকানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুটি কাজ এখনও বাকি। ধর্মান্তর নিয়ে একটি আইন এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে আরেকটি আইন। আমি দুটিই করছি।’
এদিকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের প্রস্তুতিও এগিয়ে নিচ্ছে রাজ্য সরকার। প্রস্তাবিত বিধি পর্যালোচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজ্য মন্ত্রিসভা ছয় সপ্তাহ আগে ওই কমিটি গঠনের অনুমোদন দেয়।
খসড়া বিধি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য কমিটিকে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর বিধানসভায় বিলটি উত্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২৯ জুন বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রস্তাবিত বিধির আওতায় বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন আইন কার্যকর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে সংবিধানগত সুরক্ষা পাওয়া শ্রেণিগুলোর অধিকার বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
আগস্টের চলমান বাজেট অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিল পাস হলে পশ্চিমবঙ্গ হবে ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা চতুর্থ রাজ্য। বিজেপির জন্যও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের ইশতেহারে দলটি সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এর মধ্যেই ধর্মান্তর ও জমি কেনাবেচা নিয়ে পৃথক আইন করার ঘোষণা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কী ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

