গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরিকল্পনাটির প্রতি হামাসের পক্ষ থেকে অস্ত্র সমর্পণের সম্মতি এলেও সেটি সরাসরি গ্রহণ করেনি ইসরাইল।
গত মাসে ট্রাম্প তাঁর উদ্যোগকে গাজায় শান্তির পথে একটি ‘বড় অগ্রগতি’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিষদ জানিয়েছিল, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি হয়েছে। তখন ট্রাম্পও দাবি করেছিলেন, ইসরাইল এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বিষয়টি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকার পর অবশেষে রোববার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, প্রস্তাবের কিছু বিষয় ইসরাইলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু বিষয় গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না।
হামাস কী শর্তে অস্ত্র ছাড়তে রাজি?
ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, হামাসসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগ করার কথা ছিল। তবে হামাসও বিষয়টি নিঃশর্তভাবে মেনে নেয়নি।
গোষ্ঠীটির প্রস্তাব ছিল, তাদের অস্ত্র একটি নতুন ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও শান্তি পরিষদের সমর্থনে গঠিত এই কমিটির নাম গাজা প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি।
কমিটিটি গাজা পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা থাকলেও ইসরাইল এখনো তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বর্তমানে কমিটির কার্যক্রম মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রস্তাবের খসড়া অনুযায়ী, ভারী অস্ত্র, অস্ত্রের গুদাম, সামরিক সরঞ্জাম তৈরির স্থাপনা ও সুড়ঙ্গগুলোর তালিকা তৈরি এবং সেগুলো সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। এর সঙ্গে গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।
গাজায় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মখাইমার আবুসাদা মনে করেন, অস্ত্র সমর্পণে হামাসের সম্মতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে হামাস নিজেদের নিরস্ত্র করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে এলেও এবার প্রকাশ্যে অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে।
তবে অস্ত্র কীভাবে হস্তান্তর, সংরক্ষণ ও তদারকি করা হবে—তার সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
মূল বিরোধ প্রত্যাহারের সময় নিয়ে
ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতবিরোধ দেখা দিয়েছে একটি প্রশ্নে—কে আগে কী করবে?
হামাসের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইল গাজায় হামলা বন্ধ করে তাদের বাহিনীকে ‘হলুদ সীমারেখা’ পর্যন্ত সরিয়ে নিলে তারা অস্ত্র সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গাজার ভেতরে ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার সীমা হিসেবে এই রেখা নির্ধারিত হয়েছিল।
অন্যদিকে ইসরাইলের অবস্থান অনেক আগে থেকেই স্পষ্ট—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তারা সেনা প্রত্যাহার করবে না।
ট্রাম্পের বক্তব্যেও বিষয়টি কিছুটা দ্ব্যর্থক হয়ে উঠেছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছিলেন, নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার করবে।
এই ধারাবাহিকতার প্রশ্নটিই এখন পুরো পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরাইলের ভয় কোথায়?
ইসরাইলের দৃষ্টিতে হামাসকে অস্ত্র রাখার কোনো সুযোগ দেওয়া নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়োসি কুপারভাসার মনে করেন, অস্ত্র গাজায় থেকে গেলে হামাস দ্রুত আবার নিজেদের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে।
তাঁর আরেকটি আপত্তি হলো, নতুন পরিকল্পনায় গাজার ‘উগ্রবাদমুক্তকরণ’ নিয়ে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। তাঁর আশঙ্কা, ইসরাইল বাহিনী সরে গেলে হামাস আবার গাজার নিয়ন্ত্রণে ফিরে এসে নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।
হামাস অবশ্য এরই মধ্যে গাজায় তাদের জরুরি সরকার বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, যাতে নতুন প্রশাসনিক কমিটি দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু ইসরাইল এটিকে মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে হামাসের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
হামলা ও দখল নিয়েও বিরোধ
২০২৫ সালের অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় ইসরাইলি হামলায় প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওই সময় থেকে ইসরাইলি হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলি বাহিনী গাজার আরও ভেতরে অগ্রসর হয়েছে। অক্টোবর মাসে গাজার ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে তা ৬০ শতাংশের বেশি হয়েছে। এ বছরের শুরুতে নেতানিয়াহু বাহিনীকে আরও অগ্রসর হয়ে ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শান্তি পরিষদের গাজার বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভও ইসরাইলের হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু চুক্তি করলেই হবে না; সেটির বাস্তবায়ন ও যাচাইও নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসরাইলি বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে।
হালকা অস্ত্র নিয়েও বড় প্রশ্ন
ভারী অস্ত্র ও রকেটের পাশাপাশি গাজায় ব্যক্তিগত অস্ত্রের বিষয়টিও জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ব্যক্তিগত অস্ত্র ফিলিস্তিনি আইনের অধীনে রাখার কথা বলা হয়েছে। গাজা প্রশাসনের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ হিসেবে জাতীয় কমিটিই অস্ত্র নিবন্ধন, লাইসেন্স দেওয়া বা বাতিল করা এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নেবে।
আবুসাদার ধারণা, গাজায় হামাস, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, পরিবার ও বিভিন্ন গোত্রের হাতে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার হালকা অস্ত্র থাকতে পারে। ঘরে ঘরে গিয়ে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করা সহজ হবে না বলেও তিনি মনে করেন।
তবে তাঁর মতে, এসব হালকা অস্ত্র ইসরাইল বা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের সামরিক হুমকি তৈরি করে না।
সামনে ইসরাইলের নির্বাচন
গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটির পরবর্তী নির্বাচন আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য হামাসের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় যাওয়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যা তাঁর জোটের কট্টরপন্থী অংশের বিরোধিতার মুখে পড়ে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানকে বড় সংকট হিসেবে দেখছে না। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন মনে করছে এটি ইসরাইলের নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হতে পারে। তবে গাজায় হামলা কমানোর বিষয়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান মেনে চলবেন—এটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনার সামনে মূল বাধা এখন হামাসের অস্ত্র সমর্পণ নয়, বরং নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কোনটি আগে হবে—এই প্রশ্ন।
হামাস অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু ইসরাইল চায়, অস্ত্র পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার পরই তারা গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করুক। আর এই দুই অবস্থানের মধ্যকার দূরত্বই আপাতত ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগকে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে।

