মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় আবারও বড় ধস নেমেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, তার কার্যক্রমে সমর্থন জানানো মার্কিন নাগরিকের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ শতাংশে। একই সময়ে ৬৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পের কার্যক্ষমতাকে অনুমোদন করেন না।
রয়টার্স/ইপসোসের চার দিনব্যাপী জরিপ, যা সোমবার শেষ হয়েছে, তাতে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে এটিই সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তার হার হিসেবে উঠে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে তার অনুমোদন হার ছিল ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানেই আরও ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার সর্বনিম্ন অনুমোদন হার ছিল ৩৩ শতাংশ। নতুন জরিপে সেই সীমাতেই আবার নেমে এসেছে তার জনপ্রিয়তা।
ইরান যুদ্ধই কি বড় কারণ?
জরিপের ফলাফল এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগ বাড়ছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে শুরুতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত সেই প্রতিশ্রুতির ওপর নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চলতি বছর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি হতে শুরু করে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এই সংঘাতের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানির দামও বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
অর্থাৎ ট্রাম্পের জন্য সমস্যা শুধু যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নয়; যুদ্ধের কারণে যদি জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি সাধারণ ভোটারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা কমছে
জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করছেন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত দ্রুত শেষ হবে না।
জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতেও এ নিয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য দেখা গেছে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭১ শতাংশ মনে করেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
অন্যদিকে মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, এই সংঘাত সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
এই পরিসংখ্যান ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালির প্রভাব
ইরান সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংঘাত কিছুটা শিথিল হলেও ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল বাণিজ্য অনেকটাই আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। ফলে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু হোয়াইট হাউসের জন্য নয়, তার রিপাবলিকান দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য লড়াই করবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্ররা। প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে গেলে তার প্রভাব দলীয় প্রার্থীদের ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষ করে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ—এই তিনটি বিষয় যদি ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে ওঠে, তাহলে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী কৌশল আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
একদিকে ট্রাম্পকে নিজের নীতির পক্ষে জনসমর্থন ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে দলের প্রার্থীদেরও ভোটারদের বোঝাতে হবে যে বর্তমান অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের পরিকল্পনা কার্যকর।
প্রথম মেয়াদের রেকর্ডও ফিরে এলো
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তার ওঠানামা নতুন কিছু নয়। প্রথম মেয়াদেও তার অনুমোদন হার বিভিন্ন সময়ে কমেছে। তবে নতুন জরিপের বিশেষ তাৎপর্য হলো, বর্তমান মেয়াদে তার জনপ্রিয়তা আবার ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে—যে হার ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের সর্বনিম্ন পর্যায়ের সঙ্গে মিলে গেছে।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর শুরুতে ট্রাম্প দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের ঘটনাপ্রবাহ সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন করে তুলেছে।
ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তার প্রশাসনের সামনে এখন বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এই জনমত পরিবর্তন সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রবণতার সূচনা। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে এলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

