রাশিয়ায় ব্যাংকে রাখা অর্থ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় সামলাতে সরকার একসময় ব্যাংক আমানতে হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন আশঙ্কার পাশাপাশি অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক লেনদেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের ব্যাংকিং আচরণে। বিপুলসংখ্যক রুশ নাগরিক ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে হাতে রাখছেন।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশটিতে প্রচলিত নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ২৮৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন রুবল, যা প্রায় ৩৪০ কোটি ডলারের সমান। এর মধ্য দিয়ে টানা সপ্তম মাসে দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নগদ অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন রুবল, যা প্রায় ২ হাজার ৮২০ কোটি ডলার। এই পরিমাণ ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম বছরে ব্যাংক থেকে নগদ তুলে নেওয়ার আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। সে বছর মোট প্রায় দুই ট্রিলিয়ন রুবল ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
আগস্টেই বাড়ছে নগদের চাহিদা
চলতি আগস্ট মাসে প্রায় প্রতিটি কর্মদিবসেই ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ তুলে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ আগস্ট ছিল সবচেয়ে বড় উত্তোলনের দিন। ওই দিনে ব্যাংকগুলো থেকে ৫৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন রুবল, অর্থাৎ প্রায় ৬৭ কোটি ডলার তুলে নেওয়া হয়।
এর আগে জুলাই মাসেও নগদ উত্তোলনে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ওই মাসে ব্যাংক থেকে ৬২০ বিলিয়ন রুবলেরও বেশি অর্থ তুলে নেওয়া হয়, যার মূল্য প্রায় ৭৩০ কোটি ডলার।
ফলে শুধু সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতাই বাড়ছে না, ব্যাংকগুলোর ওপরও নগদ অর্থের চাপ তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হয়েছে।
রুশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রুবলের ঘাটতি ২০২২ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ অর্থের চাপ বাড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই সরকারি বন্ড কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না।
আমানত বাজেয়াপ্তের গুঞ্জন
ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার পেছনে সবচেয়ে আলোচিত কারণগুলোর একটি হলো আমানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার আশঙ্কা। চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়ার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যানেলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, সরকার শিগগিরই নাগরিকদের ব্যাংক আমানত বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
তবে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ এই ধরনের প্রচারকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তারপরও মানুষের আচরণে এর প্রভাব পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে গুজব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ যুক্ত হয়ে অনেক মানুষ নিরাপদ মনে করে ব্যাংকের পরিবর্তে হাতে নগদ অর্থ রাখছেন।
এক সাবেক রুশ অর্থ কর্মকর্তা পরিস্থিতিটি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, চারদিকে ড্রোন হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের খবর থাকায় মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যাংকে রাখার চেয়ে নিজের কাছে নগদ অর্থ রাখা তুলনামূলক নিরাপদ।
যুদ্ধের প্রভাব এবার ঘরের অর্থনীতিতেও
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পঞ্চম বছরে এসে যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনেও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্থাপনায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলা দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। এতে অনেক নাগরিক স্বাভাবিকভাবে ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের ওপর আস্থা কমে গিয়ে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ছে।
কর বৃদ্ধি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর সরকারের বাড়তি নজরদারিও মানুষকে নগদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি স্বাধীন রুশ অর্থনৈতিক সাময়িকীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একসময় রাশিয়া নগদবিহীন লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অগ্রণী দেশগুলোর কাতারে উঠে এসেছিল। কিন্তু এখন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে নাগরিকদের আবার নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য থাকে না। একই সময়ে বাড়তি কর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসা—দুই ক্ষেত্রেই নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে।
বড় কোম্পানিগুলোও টাকা সরাচ্ছে
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় কোম্পানিও রাশিয়া থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নিজেদের সম্পদ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেই রাশিয়ার ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন রুবল, অর্থাৎ প্রায় ৯৪০ কোটি ডলার তুলে নেওয়া হয়েছে।
এর পেছনে রাশিয়ায় গত কয়েক বছরে চালানো ব্যাপক জাতীয়করণ কার্যক্রমও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন রুবলের সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফলে দেশের ধনী ব্যবসায়ী ও কোটিপতিদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই রুশ অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
ধনকুবেরদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ
এই পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি সুযোগও তৈরি হয়েছে। যুদ্ধনির্ভর দুর্বল অর্থনীতিকে সচল রাখতে মার্চ মাসে তিনি দেশের ধনকুবেরদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।
মস্কোভিত্তিক ব্যবসা-বিষয়ক দৈনিক ভেদোমোস্তির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফেডারেল বাজেটে শত শত বিলিয়ন রুবল জমা হয়েছে।
তবে সরকারের এসব পদক্ষেপের মধ্যেও অর্থনীতি নিয়ে মানুষের আস্থা ফিরছে না। বরং চলতি বছর রুশ নাগরিকদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ রেকর্ড মাত্রায় কমেছে।
জুনে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ রুশ নাগরিক মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনারও চাপ
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে প্রকাশ্য সমালোচনাও চাপের মুখে পড়ছে। গত সপ্তাহের শেষে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আন্দ্রেই ক্লেপাচকে বরখাস্ত করা হয়।
রুশ সংবাদমাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার সমালোচনামূলক মন্তব্য প্রকাশের পর তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মস্কো পরাজিত হতে পারে।
২০১৪ সাল থেকে ওই পদে থাকা ক্লেপাচকে ক্রেমলিনের নির্দেশেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দ্য বেল-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মে মাসে দেওয়া তার একটি বক্তব্য সম্পর্কে ক্রেমলিন অবগত হওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাশিয়ার ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের প্রবাহের সাম্প্রতিক পরিবর্তন শুধু মানুষের অর্থ হাতে রাখার প্রবণতাই নয়, বরং অর্থনীতি নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। আমানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার গুঞ্জন সরকার উড়িয়ে দিলেও যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, ইন্টারনেট বিভ্রাট, করের চাপ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের ব্যাংকিং আচরণ বদলে দিচ্ছে।
ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকলে তা শুধু ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং রাশিয়ার আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসবে।

