ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখিয়ে আবারও একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (২৩ আগস্ট) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ওই মানচিত্রে হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এটি হঠাৎ কোনো বক্তব্য নয়। এর আগে গত ১৮ আগস্টও একই ধরনের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার কথা তিনি প্রথম বলেছিলেন ১৫ আগস্ট নিউইয়র্কে এক সমাবেশে। তখন তিনি দাবি করেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মানচিত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শুধু সামরিক বা ভূরাজনৈতিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে হতো। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও এর চাপ পড়তে পারে।
এরই মধ্যে প্রণালিটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে ইরান। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে হলে জাহাজগুলোকে ইরানের অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত ফি দিতে হবে। বিপরীতে ট্রাম্প দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।
দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুধু বক্তব্যের লড়াই চলছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও।
ইরানও এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করে আচরণ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।’
রেজায়ির বক্তব্যে আরও কঠোর একটি বার্তা রয়েছে। কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান। অর্থাৎ, ইরান এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের বিষয়টি দেখছে না; বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অন্য দেশগুলোর ভূমিকার বিষয়টিও নিজেদের নিরাপত্তা হিসাবের মধ্যে আনছে।
ইরানি এই কর্মকর্তা আরও সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় কোনো দেশ অংশ নিলে তাদের স্বার্থে আঘাত করা হতে পারে। এর ফলে হরমুজকে ঘিরে বিরোধের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে রেজায়ি দাবি করেছেন, এখন পর্যন্ত ইরান কোনো মার্কিন অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হামলা সামরিক ঘাঁটিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে দেশটির তেল ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ার করেছেন।
এখানেই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি দেখা যাচ্ছে। সামরিক সংঘাত যদি অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব দুই দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
রেজায়ি এমন পরিস্থিতির পরিণতি বোঝাতে বলেছেন, ট্রাম্প এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে সংঘাতের মাত্রা ‘ভূমিকম্পের মতো’ হতে পারে।
ট্রাম্পের নতুন মানচিত্র এবং ইরানের পাল্টা অবস্থান তাই নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর মধ্যে রয়েছে ভূখণ্ড, সমুদ্রপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক চাপকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর শক্তির দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

