যদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফেরা একজন প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত নিজ দেশকে আরেকটি দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে নিয়ে গেলেন—যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই দৃশ্য নতুন নয়। তবে এবার প্রশ্নটি শুধু একজন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়। এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর একটি সমস্যা: কেন মার্কিন রাষ্ট্রব্যবস্থায় যুদ্ধ শুরু করা এত সহজ, অথচ সেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা এত কঠিন?
আমেরিকার বারবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণ শুধু কোনো নির্দিষ্ট নেতা, রাজনৈতিক দল কিংবা সামরিকপন্থী গোষ্ঠী নয়। বরং দেশটির ক্ষমতার কাঠামো, বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি, রাজনৈতিক প্রণোদনা, গণমাধ্যমের পরিবেশ এবং যুদ্ধের প্রকৃত খরচ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেকটাই আড়ালে থাকার কারণে একই চক্র বারবার তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি থেকে নতুন সংঘাত
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে নতুন যুদ্ধ শুরু করার বদলে চলমান যুদ্ধ শেষ করার কথা বলেছিলেন। ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম বছরে তাঁর কয়েকটি পদক্ষেপে মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত সামরিক সম্পৃক্ততা থেকে কিছুটা সরে আসবে।
তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয়ের জন্য চাপ দেন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও কিছুটা সতর্ক অবস্থান অনুসরণ করেন, যার ফলে তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।
কিন্তু ক্ষমতায় ফেরার ১৮ মাস পর চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী কিছু কৌশলগত সাফল্য পেলেও লেখকের মতে, ওয়াশিংটন অর্থবহ কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির তুলনায় ইরানের প্রভাব আরও বেড়েছে।
এই জায়গাতেই একটি পুরোনো মার্কিন রাজনৈতিক বৈপরীত্য আবার সামনে আসে। বারাক ওবামাও মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।
কেন যুদ্ধ শুরু করা এত সহজ
১৯৯১ সালের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে তুলনামূলক ছোট বা সীমিত স্বার্থ রক্ষার জন্যও সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
এর একটি বড় কারণ হলো, ছোট কিংবা দূরবর্তী কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর দৃশ্যমান রাজনৈতিক মূল্য খুব বেশি মনে হয় না। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন। অনেক সময় তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবও অনুভব করেন না।
অন্যদিকে, যুদ্ধসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্যও ধীরে ধীরে বদলে গেছে।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে আর কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। এমনকি সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনও ২০০২ সালের পর আর দেওয়া হয়নি।
ফলে বাস্তবে প্রেসিডেন্টের হাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সক্রিয় সামরিক বাহিনী রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান, নৌবহর ও দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সামরিক সম্পদ। ফলে কোনো সংকট তৈরি হলে প্রেসিডেন্ট খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
সমস্যা হলো, যুদ্ধ শুরু করার মুহূর্তে যে সিদ্ধান্ত সহজ মনে হয়, কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর সেই যুদ্ধ বন্ধ করা রাজনৈতিকভাবে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল আর বাস্তবতার ব্যবধান
ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল আগের অনেক নীতির তুলনায় আলাদা ছিল।
সেখানে স্বীকার করা হয়েছিল, বিশ্বের প্রতিটি দেশ, অঞ্চল, সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। সীমিত সম্পদ কোথায় ব্যবহার করা হবে, তা অগ্রাধিকার অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল পশ্চিম গোলার্ধ এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে মধ্যপ্রাচ্যের আধিপত্যের যুগ শেষ হওয়া উচিত।
প্রথমদিকে ট্রাম্প কিছুটা সেই পথেই চলেছিলেন।
কিন্তু পরে ঘটনাপ্রবাহ অন্যদিকে মোড় নেয়।
জুন ২০২৫-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে ১২ দিনের অভিযান চালায়, সেটি স্বল্পস্থায়ী ছিল এবং এর লক্ষ্যও তুলনামূলক নির্দিষ্ট ছিল। একইভাবে জানুয়ারিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর পুরো সরকারব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। পরিবর্তে তাঁর সহসভাপতি ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়।
কিন্তু এসব অভিযানের আপাত সাফল্যই পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের পথ আরও সহজ করে দেয়।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের মাত্র এক মাস পর মার্কিন বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এতে ইরানের সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা নিহত হন।
ছয় মাস পর দেখা যায়, ইরানের সামরিক সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলেও দেশটির সরকার টিকে আছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলার ক্ষমতা ইরান আরও বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য আর কৌশলগত বিজয় একই বিষয় নয়।
সমস্যাটি কি শুধু ট্রাম্পের?
সহজ উত্তর হতে পারে—ট্রাম্প ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু বিশ্লেষণটি এখানেই থেমে যায় না।
রিপাবলিকান রাজনীতির মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে দুটি ভিন্ন ধারা রয়েছে।
একদিকে অপেক্ষাকৃত তরুণ, ‘আমেরিকা আগে’ চিন্তাধারার রাজনীতিকেরা বিদেশে সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ নিয়ে সন্দিহান। তাঁদের অনেকে মনে করেন, প্রতিটি মিত্রের নিরাপত্তার দায় যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে পুরোনো ধারার একটি শক্তিশালী অংশ এখনো মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সরকার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো সামরিক শক্তি ব্যবহারের সমর্থকদের সঙ্গে সহসভাপতি জেডি ভ্যান্সের মতো সংযমপন্থীদের মতবিরোধও আলোচনায় এসেছে।
তবে ব্যক্তিদের বদলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণার বিরুদ্ধেই মূল সতর্কবার্তা।
কারণ ব্যক্তি বদলালেও যুদ্ধের পক্ষে কাজ করা প্রতিষ্ঠান, সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সুবিধাগুলো থেকে যায়।
মিত্ররাও কখনো যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়
যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত মিত্রজোট তার বৈশ্বিক প্রভাবের বড় উৎস। কিন্তু একই ব্যবস্থা কখনো কখনো তাকে সংঘাতে টেনে আনার পথও তৈরি করে।
আঞ্চলিক কোনো মিত্র যখন নিজে হুমকির মুখে পড়ে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে চাইবে। আর সেই অঞ্চলে যদি আগে থেকেই মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুক্ত হওয়ার যুক্তি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
মার্চে রুবিও এমন যুক্তিই দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইসরায়েল হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়বে; ফলে ওয়াশিংটনের জন্য সেই সংঘাতে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন হয়ে উঠবে।
এখানে একটি অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়।
মিত্রকে রক্ষা করার জন্য বিদেশে ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। পরে সেই ঘাঁটিতে থাকা সেনাদের রক্ষার যুক্তিতে নতুন যুদ্ধে অংশ নেওয়া হয়।
যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে শেষ করা কঠিন
মার্কিন কৌশলগত সংস্কৃতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, সীমিত সাফল্য মেনে নিতে না চাওয়া।
ঠান্ডা যুদ্ধে বিজয়ের পর ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন এমন ধারণা শক্তিশালী ছিল যে যথেষ্ট সামরিক শক্তি ব্যবহার করলে অন্য দেশের সরকারব্যবস্থা, সমাজ কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতাও পরিবর্তন করা সম্ভব।
বাস্তবে সামরিক বাহিনী একটি প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করতে পারে কিংবা সরকার পতনে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু একটি স্থিতিশীল সমাজ, কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এই পার্থক্য স্পষ্ট করেছে।
তবু ব্যর্থতার কারণ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে প্রায়ই বলা হয়—যুদ্ধটি ভুল ছিল না, বরং যথেষ্ট শক্তি ব্যবহার করা হয়নি অথবা ভুল কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের জন্য অনেক রিপাবলিকান নেতা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের বদলে ওবামার সেনা প্রত্যাহারকে দায়ী করেছিলেন।
এই মানসিকতায় যুদ্ধের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন কম ওঠে; বরং প্রশ্ন ওঠে কীভাবে আরও ভালোভাবে যুদ্ধ করা যেত।
ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ কি ছিল?
সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতের আগে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকি ব্যবহার করে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছিল বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর অল্প সময় আগে ইরান দেশের ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের আবার প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই সমঝোতাকে যথেষ্ট মনে করেনি।
পরিবর্তে তারা পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের সম্ভাবনার ওপর বাজি ধরে।
এই ঘটনাটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি পরিচিত সমস্যাকে সামনে আনে—আংশিকভাবে ভালো কোনো ফল গ্রহণ না করে সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শতভাগ বিজয় খুব কমই সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে সীমিত সমঝোতাই দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের চেয়ে বেশি লাভজনক হতে পারে।
সাধারণ মানুষ যুদ্ধের মূল্য কতটা বোঝে?
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ তুলনামূলক দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো যুদ্ধের সরাসরি মূল্য জনসংখ্যার খুব ছোট একটি অংশ বহন করে।
দেশটিতে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বদলে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী রয়েছে। ফলে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মানবিক ঝুঁকি বহন করেন সেনাসদস্য এবং তাঁদের পরিবার।
ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রায় ৭,০০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে বড়, কিন্তু কোরিয়া কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনায় অনেক কম।
প্রযুক্তির অগ্রগতিও দূর থেকে যুদ্ধ চালানো সহজ করেছে। কম সংখ্যক সেনা ব্যবহার করেও বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দূরপাল্লার অন্যান্য ব্যবস্থা দিয়ে সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে।
ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকের কাছে যুদ্ধ অনেক সময় একটি দূরের ঘটনা।
সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব তাদের জন্য এসেছে দ্রব্যমূল্যের মাধ্যমে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের পূর্বাভাসের তুলনায় কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের জনসংখ্যা ৯৩ মিলিয়ন। দেশটির নেতৃত্বকে হত্যা, সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোয় বোমা হামলা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরির পরও গড় মার্কিন নাগরিকের জীবনে সবচেয়ে স্পষ্ট তাৎক্ষণিক প্রভাব ছিল মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি।
মে মাসে মূল্যস্ফীতি দুই শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৪.৮ শতাংশে পৌঁছায়। পরে তা কমে ৩.৫ শতাংশে নেমে আসে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের ভয়াবহতা যদি মূলত অন্য দেশে অনুভূত হয়, কিন্তু নিজ দেশের নাগরিকদের কাছে তার মূল্য শুধু বাজারে কিছু বাড়তি খরচ হিসেবে ধরা পড়ে, তাহলে যুদ্ধবিরোধী জনমত দ্রুত বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেওয়া কঠিন হয়।
জুলাইয়ের ওয়াশিংটন পোস্ট–ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ তখন মার্কিনদের মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ষষ্ঠ বছরের মতোই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তারপরও রাস্তায় বড় আকারের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি এখনো চোখে পড়ছে না
যুদ্ধের তাৎক্ষণিক মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্যই পুরো চিত্র নয়।
দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় প্রশ্ন হলো—একটি পরাশক্তি যখন তুলনামূলক গৌণ সংঘাতে বিপুল অস্ত্র, অর্থ এবং রাজনৈতিক মনোযোগ ব্যয় করে, তখন সত্যিকারের বড় সংকট দেখা দিলে তার হাতে কী থাকে?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র থেকে কোনো ঘাঁটি কিংবা মিত্রকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত প্রতিটি প্রতিরোধী অস্ত্র অন্য অঞ্চলের জন্য আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না।
একটি অস্ত্র ছোড়ার সময় শুধু তার বর্তমান লক্ষ্য নয়, বিকল্প ব্যবহারও হারিয়ে যায়।
পূর্ব এশিয়া, বাল্টিক অঞ্চল কিংবা অন্য কোথাও যদি একই সময়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়, তখন এই ঘাটতির মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিকে নিরুৎসাহিত করার জন্য শুধু রাজনৈতিক সংকল্প যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব সামরিক সক্ষমতা।
মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় মানে অন্য জায়গায় ঘাটতি
সুযোগ হারানোর খরচটি শুধু গোলাবারুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সেনারা একই সময়ে অন্য অঞ্চলে থাকতে পারে না। যুদ্ধে ব্যয় করা অর্থ নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক অস্ত্র কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার করা যায় না।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি পুনর্নির্মাণে যে অর্থ প্রয়োজন, সেই অর্থ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটি শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা সম্ভব হতো।
সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ আবার একটি বিশেষ ধরনের সামরিক বাহিনীও দাবি করে। এতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন অনেক বেশি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগর কিংবা তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সংকটকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাহলে তার প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের সামরিক কাঠামো।
অর্থাৎ একটি অঞ্চলে পুরোনো ধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকলে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় বাহিনী তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ালেই কি সমাধান?
প্রশাসনের প্রস্তাবিত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ।
কয়েক দশকের মধ্যে এটি অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার সামরিক ব্যয়।
কিন্তু বাজেট বাড়িয়ে প্রতিটি ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব—এমন ধারণাও প্রশ্নের মুখে।
রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করলে সেই অর্থ শিক্ষা, অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি কিংবা অন্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায় না।
দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র কত অর্থ ব্যয় করতে পারে তা নয়। প্রশ্ন হলো—সেই অর্থ কোথায় ব্যয় করলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সবচেয়ে বেশি বাড়বে।
বৈশ্বিক ভাবমূর্তির ক্ষয়
দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আন্তর্জাতিক নৌপথ ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে যখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ভূমিকার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
জরিপে এখন বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি মূল্য হলো কূটনৈতিক মনোযোগের ক্ষয়।
একটি বড় সংঘাত শুধু সেনা ও অর্থ নেয় না; প্রেসিডেন্ট, কূটনীতিক, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের সময়ও দখল করে নেয়।
ফলে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকটে সক্রিয় থাকার ক্ষমতা কমে যায়।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন শান্তি প্রচেষ্টাও অনেকটাই পিছিয়ে গেছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
আজকের যুদ্ধ কি আগামী দিনের সিদ্ধান্ত কেড়ে নিচ্ছে?
তাইওয়ানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে—এ প্রশ্নে ওয়াশিংটনে এখনো কোনো পরিষ্কার ঐকমত্য নেই।
চীন আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাইওয়ানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে কি না, তা নিয়ে বহু বছর ধরে বিস্তর বিতর্ক চলছে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যদি প্রয়োজনীয় অস্ত্রের বড় অংশ আগেই ব্যবহার হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই বিতর্ক অর্থহীনও হয়ে যেতে পারে।
কারণ তখন প্রশ্নটি আর ‘যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যাবে কি না’ থাকবে না। প্রশ্ন হবে ‘যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়ার মতো সক্ষমতা আছে কি না’।
এটাই অতিরিক্ত সামরিক সম্পৃক্ততার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি।
আজকের ছোট সিদ্ধান্তগুলো আগামী দিনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই কমিয়ে দিতে পারে।
তাহলে পরিবর্তনের পথ কী?
শুধু এমন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা, যিনি যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেবেন—এটি যথেষ্ট নয়।
কারণ ওবামা এবং ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে কাঠামো পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা কিছু অগ্রবর্তী মার্কিন ঘাঁটি কমানোর প্রশ্ন বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপের সক্ষমতা কমবে এবং সংকট দেখা দিলেই যুদ্ধের দিকে যাওয়ার প্রণোদনাও কিছুটা হ্রাস পাবে।
দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসকে যুদ্ধসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে প্রতিরক্ষা দপ্তর ইতিমধ্যে বিদ্যমান তহবিলের ওপর চাপের মুখে পড়েছে। কংগ্রেস চাইলে নতুন জরুরি অর্থ বরাদ্দ আটকে দিয়ে নির্বাহী বিভাগের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
শুধু শুনানি নিয়ে কর্মকর্তাদের কঠিন প্রশ্ন করলেই যথেষ্ট নয়। অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ব্যবহার না করলে সেই নজরদারি অনেক সময় প্রতীকী হয়েই থেকে যায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রতিরক্ষা শিল্প এবং নীতিনির্ধারণের সম্পর্ক।
প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কংগ্রেসে প্রভাব বিস্তারে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। সামরিক ও সরকারি উচ্চপদ থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাভজনক পদে যোগ দেওয়ার পথও দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়।
আইনপ্রণেতাদের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারি পদ ও প্রতিরক্ষা ব্যবসার মধ্যকার এই ঘূর্ণায়মান সম্পর্ক সীমিত করার মতো পদক্ষেপ স্বার্থের সংঘাত কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আসল প্রশ্ন যুদ্ধ করা যায় কি না নয়
মার্কিন জনগণের বড় একটি অংশ বহু আগেই মধ্যপ্রাচ্যে সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
তারপরও যুদ্ধ থামেনি।
ওবামা ক্ষমতায় এসেছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশের যুদ্ধনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তার প্রায় ২০ বছর পরও একই বিতর্ক চলছে।
এর অর্থ সমস্যাটি জনমতের অভাব নয়। সমস্যাটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা রাজনৈতিকভাবে সহজ এবং এর স্বল্পমেয়াদি মূল্য তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান।
কিন্তু অদৃশ্য মূল্য মানেই মূল্যহীন নয়।
গোলাবারুদ কমে যাচ্ছে, সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে, জাতীয় ঋণ বাড়ছে, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ কমছে এবং বৈশ্বিক প্রভাব ক্ষয়ে যাচ্ছে।
আজ এসব ক্ষতি হয়তো সাধারণ নাগরিকের চোখে খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু ২০ বছর পর এর ফল হতে পারে অনেক গভীর—কম কার্যকর সামরিক বাহিনী, দুর্বল অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কম প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র।
তাই আমেরিকার সামনে মূল প্রশ্নটি আর শুধু কোথায় যুদ্ধ করবে তা নয়।
বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো—সে কি নিজেই ঠিক করবে কোন লড়াই সত্যিই তার জন্য প্রয়োজনীয়, নাকি একের পর এক সংঘাত তার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই ধীরে ধীরে কেড়ে নেবে?
পরাশক্তির শক্তি শুধু কতগুলো যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতায় মাপা যায় না। প্রয়োজনের সময় কোন যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক সংযম তার আছে কি না, সেটিও শক্তিরই একটি পরীক্ষা।

