যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দিন ধরে বন্ধ থাকার ঘটনায় ইরানি হ্যাকারদের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। দেশটির নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এটি একটি পরিকল্পিত সাইবার হামলার ফল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়; বরং আধুনিক বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ গতকাল শনিবার জানিয়েছে, এই সাইবার হামলার পেছনে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর চালানো সবচেয়ে সফল সাইবার আক্রমণগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।
তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র আক্রান্ত হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। জানা গেছে, আক্রান্ত কেন্দ্রটি আকারে তুলনামূলক ছোট ছিল এবং এটি বন্ধ থাকার কারণে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হয়নি।
চার দিন অচল ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্র
তথ্য অনুযায়ী, সাইবার হামলার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রম চার দিন বন্ধ ছিল। এ সময় প্রকৌশলী ও কর্মীরা কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করার জন্য কাজ করেন।
যদিও ঘটনাটি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি, তবুও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ একটি দেশের বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা হলে তা বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের বিষয়টি জানায়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য পরামর্শ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইরানের দিকে কেন সন্দেহ?
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হামলার উদ্দেশ্য সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্ষতি করা নাও হতে পারে। বরং এর মাধ্যমে কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করাই মূল লক্ষ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাইবার সক্ষমতা বাড়িয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য অনেক সময় সামরিক বা কৌশলগত স্থাপনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও হয়ে থাকে।
এ ধরনের হামলার মাধ্যমে কোনো দেশ বা গোষ্ঠী প্রতিপক্ষকে একটি বার্তা দিতে পারে যে, প্রয়োজন হলে তারা বিদ্যুৎ, পানি বা যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও আঘাত হানতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামোতেও হামলা
এই ঘটনার সময়ের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিষয়টি হোয়াইট হাউসের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক ডজন বর্জ্যপানি শোধনাগার এই হামলার শিকার হয়। এর ফলে কোথাও কোথাও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়, পানির চাপ কমে যায় এবং অনেক জায়গায় বাসিন্দাদের পানি ব্যবহারের আগে ফুটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২৬ জুলাই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রথম হামলার খবর পাওয়া যায়। এরপর মিশিগান, জর্জিয়া, সাউথ ডাকোটা ও নিউ জার্সিতেও একই ধরনের একাধিক ঘটনা সামনে আসে।
প্রথম দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এসব হামলার জন্য ‘ক্ষতিকর সাইবার হামলাকারীদের’ দায়ী করলেও পরে সরকারি সূত্রগুলো জানায়, এসব ঘটনার সঙ্গে তেহরানের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাইবার যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরান-সংশ্লিষ্ট সাইবার কার্যক্রম বেড়েছে বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে।
জার্মানি, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও ইরানের সন্দেহভাজন সাইবার হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য সাধারণত ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করার পর এ ধরনের সাইবার কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ব্রিটেনের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি) দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সতর্ক করে আসছে। সংস্থাটি বিদেশি রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত পরামর্শ দেয়।
তবে পৃথক সাইবার হামলার ঘটনা নিয়ে এনসিএসসি সাধারণত প্রকাশ্যে মন্তব্য করে না। যুক্তরাজ্যের ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার বিষয়েও সংস্থাটি কোনো বিস্তারিত বক্তব্য দেয়নি।
এর আগে বড় ধরনের সাইবার হামলায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), স্কুল এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া বিদেশি হ্যাকাররা খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকের তথ্য চুরি করেছে এবং গত বছর ব্রিটেনের ইলেক্টোরাল কমিশনের ভোটার তথ্যও চুরির ঘটনা ঘটে।
ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এবার যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি অচল করতে সক্ষম হওয়া একটি প্রতীকী ঘটনা হতে পারে। যদিও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল, তবে এটি দেখিয়েছে যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাইবার হামলার বাইরে নয়।
গত বছর ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিটি জানিয়েছিল, ব্রিটিশ অবকাঠামোয় ইরানি সাইবার হামলার সম্ভাবনা ‘কম’। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান সাইবার সক্ষমতায় শক্তিশালী এবং দেশটি হ্যাকার গোষ্ঠীগুলোর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
গত মাসে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভা দপ্তরের প্রকাশিত সরকারি ঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ওপর গুরুতর ও সফল সাইবার হামলার ঝুঁকি ৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এসব হামলাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
সরকারের বক্তব্য
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সংশ্লিষ্ট খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ঘটনাটি একটি ছোট আকারের জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রকে প্রভাবিত করেছে। কোনো পর্যায়েই এটি যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেনি।
তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। কারণ আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্র নয়, কম্পিউটার কোডও একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

