গাড়ি বিক্রি করেই জীবন চলে ক্লিমেন্ট ভ্যান্ডেনকেরখোভের। কিন্তু সম্প্রতি তার জীবনে এসেছে এক চমকপ্রদ মোড়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বেলজিয়ামের এই ২৬ বছর বয়সি যুবক স্বীকৃতি পেয়েছেন রাজপুত্র হিসেবে। আইনগতভাবে বেলজিয়ামের বর্তমান রাজা ফিলিপের ভাই প্রিন্স লরেন্ট তাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরই এই ঘোষণা এল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এখন রাজপুত্র, কিন্তু রাজকীয় কোনো ভাতা পাবেন না তিনি।
কিন্তু কেন এত বছর পর এই স্বীকৃতি? ক্লিমেন্টের মা ওয়েন্ডি ভ্যান ওয়ানটেন, একজন বেলজিয়ান গায়িকা। ২০০৩ সালে প্রিন্সেস ক্লেয়ারকে বিয়ে করার আগে প্রিন্স লরেন্টের সঙ্গে ওয়েন্ডির সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক থেকেই ক্লিমেন্টের জন্ম। তবে দীর্ঘদিন এই সত্য গোপন ছিল। ক্লিমেন্ট যখন ১৬ বছর বয়সী, তখন তার মা তাকে জানান তার বাবা কে। কিন্তু তখনও তিনি রাজকুমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার সাহস পাননি।
২০১৩ সালের ঘটনা। ক্লিমেন্ট একটি শপিং মলে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রিন্স লরেন্টের মুখোমুখি হন। কিন্তু তখন তিনি বুঝতেই পারেননি উল্টো পথে হাঁটা ব্যক্তিটি আসলে কে। চার বছর পর তিনি ফোন করার সাহস করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রিন্স লরেন্ট নিজেই ডিএনএ পরীক্ষার পরামর্শ দেন। ক্লিমেন্ট ভিটিএম টিভি চ্যানেলকে জানিয়েছেন, একসঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তারা। প্রিন্স লরেন্ট তখন বলেছিলেন ‘আমি আগে যাচ্ছি, যাতে তোমার স্বস্তি লাগে’। ল্যাবরেটরি থেকে ইমেইলে আসে ফল ৯৯.৫ শতাংশ ডিএনএ মিল রয়েছে।
ছয় মাস আগে একটি টাউন হল অনুষ্ঠানে প্রিন্স লরেন্টের পরিবারে গোপনে গ্রহণ করা হয় ক্লিমেন্টকে। তবে সম্প্রতিই এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সৎবোন প্রিন্সেস লুই এবং সৎভাই প্রিন্স আইমেরিক ও প্রিন্স নিকোলাসের মতো রাজকীয় উত্তরাধিকারের তালিকায় স্থান পাবেন না ক্লিমেন্ট। এমনকি তিনি কোনো প্রকাশ্য রাজকীয় কার্যক্রমেও অংশ নেবেন না। তবে তিনি এখন আইনগতভাবে ‘স্যাক্সে-কোবার্গ’ নাম ব্যবহারের অধিকারী। কিন্তু ক্লিমেন্ট এখনও নিশ্চিত নন সেই নাম নেবেন কি না।
বেলজিয়ামের সংবাদমাধ্যম ‘হেট নিউজব্ল্যাড’-কে ক্লিমেন্ট জানিয়েছেন, ‘হয়তো সেটি করতে পারি, তবে ভ্যান্ডেনকেরখোভ নাম নিয়ে আমি গর্বিত। আমি যদি এই পারিবারিক নামটি ত্যাগ করি, তবে তা আমার মা আমার জন্য যা করেছেন তার প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হবে’। তিনি আরও জানান, মাকে তিনি অনেক ভালোবাসেন এবং তাঁর সংগ্রামের কথা কখনো ভোলেন না।
এই ঘটনা বেলজিয়ামের রাজপরিবারের জন্য নতুন নয়। ক্লিমেন্টের দাদা সাবেক রাজা দ্বিতীয় অ্যালবার্টও একই পথে হেঁটেছেন। ২০২০ সালে তিনি স্বীকার করেন, একটি সম্পর্কের সময় তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। শেষপর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি ডেলফিন বোয়েলকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ডেলফিন এখন নিজেকে ডেলফিন দে স্যাক্সে-কোবার্গ নামে পরিচয় দেন এবং তিনি রাজকন্যা হিসেবে স্বীকৃত। সেই সময় পিতৃত্বের বিষয়ে সমালোচনা তৈরি হলে ২০১৩ সালে দ্বিতীয় অ্যালবার্ট রাজার পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
বেলজিয়ামের আইনে ২০১৩ সালে পরিবর্তন আসে। এখন রাজপরিবারের কেবল কয়েকজন সদস্য সরকারি ভাতা পাওয়ার অধিকারী রাজা ফিলিপ, তার পিতা সাবেক রাজা দ্বিতীয় অ্যালবার্ট, প্রিন্স লরেন্ট এবং প্রিন্সেস আস্ট্রিড। ক্লিমেন্ট তাই কোনো আর্থিক সুবিধা পাবেন না। তবে নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজকীয় মর্যাদা। গাড়ি বিক্রেতা থেকে রাজপুত্র এই অসাধারণ যাত্রার গল্প হয়তো নিজেই এক চলচ্চিত্রের মতো।

