ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবার সামরিক সীমা ছাড়িয়ে আরও বড় অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে এগোতে পারে। তেহরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার নতুন প্রধান মোহসেন রেজাই প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপের অভিযানে কোনো দেশ অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান। শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বার্থে সরাসরি আঘাত করা হতে পারে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
রোববার ২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া প্রথম বড় সাক্ষাৎকারে রেজাই এই কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপকে কেবল নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে যুদ্ধেরই আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে।
রেজাই বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের বিকল্প পথগুলোও যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রতিবেশী দেশগুলো ব্যবহার করে, তাহলে সেসব পথ ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে যুক্ত হলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সেই দেশের স্বার্থও আঘাতের মুখে পড়তে পারে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। ফলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে কোনো নতুন উত্তেজনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, তেল পরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য ব্যবস্থায়।
মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থে পাল্টা আঘাতের সরাসরি হুমকি। ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান দাবি করেছেন, এখন পর্যন্ত ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামো বা বাণিজ্যিক স্বার্থে হামলা চালানো হয়নি। তবে ওয়াশিংটন যদি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রেজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের আশপাশে এবং অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হলে এসব প্রতিষ্ঠানও ইরানের পাল্টা আঘাতের আওতায় আসতে পারে। অর্থাৎ তেহরান এখন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুকেও সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আনছে।
রেজাই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরাকের সঙ্গে ১৯৮০-৮৮ সালের যুদ্ধে তিনি বাহিনীটির সর্বাধিনায়ক ছিলেন। চলতি মাসে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক পদগুলোতে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব নিয়োগকে তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় রেজাইয়ের নতুন বক্তব্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
ইরানের এই অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ বড় ভূমিকা রাখছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তাঁর হুমকি ছিল, ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বা ব্যবসা করা দেশগুলোকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। এর ফলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শুধু তেহরানের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাণিজ্যিক অংশীদার ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানেই ইরানের পাল্টা কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তেহরান বুঝতে পারছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় কার্যকারিতা আসে যখন কোনো দেশের বাণিজ্যিক অংশীদাররাও সেই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই প্রতিবেশীদের আগেই সতর্ক করে ইরান মূলত তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যয় বাড়াতে চাইছে। কোনো দেশ যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তাহলে তাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপ নয়, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে—রেজাইয়ের বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আরও জটিল। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহের মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত রাখবে। অন্যদিকে চীন, ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। বেইজিংয়ের অবস্থান হলো, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়।
ফলে ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে তার আশপাশের দেশগুলোর অবস্থানও পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিবেশীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করার এই কৌশল তেহরানের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ কোনো আঞ্চলিক দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত হলে তার বাণিজ্যিক ও জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের বন্দরগুলো থেকে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। ইরানের অর্থনীতির জন্য তেল রপ্তানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই চাপ তেহরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ধারণাও প্রকাশ্যে তুলেছেন। সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার ধারণা তাঁর পছন্দ। শুক্রবার দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক সমাবেশেও তিনি হরমুজ প্রণালিকে বর্তমানে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে দেখার কথা বলেন। শনিবার রাতেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি মানচিত্র প্রকাশ করে হরমুজ প্রণালিকে নতুন মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই বক্তব্যের বিপরীতে রেজাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরানের প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই জলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফি আরোপের বিষয়ও সামনে আসতে পারে। অর্থাৎ হরমুজকে কেন্দ্র করে শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণ নয়, ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির চিন্তাভাবনাও জোরদার হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্যারিসে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। সৌদি যুবরাজের দুই দিনের এই সফর রোববার শুরু হওয়ার কথা। তাঁদের আলোচনায় হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের পরিকল্পনা গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মধ্যে উপসাগরের বাইরে ওমানের বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়ানো, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে তেল পরিবহনের পাইপলাইন সম্প্রসারণ বা দ্বিগুণ করা এবং নতুন রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির ওপর আঞ্চলিক বাণিজ্যের নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
ফ্রান্স ও সৌদি আরব ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে একটি যৌথ কর্মদল গঠন করেছে। সোমবার মন্ত্রী পর্যায়ে ওই কর্মদলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কোন প্রকল্পগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে এবং ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী হবে—এসব বিষয় সেখানে আলোচনায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধানের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের একটি নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। এতদিন সামরিক হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে উত্তেজনা চলছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা। ইরান যদি সত্যিই অর্থনৈতিক স্বার্থকে পাল্টা আঘাতের লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়বে, ইরান কতটা কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো কতটা ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়াবে। কারণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো বড় ধরনের অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। রেজাইয়ের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সম্ভাব্য পরবর্তী পর্যায় সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও বটে।

