পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাতভর ভারী বৃষ্টির পর বিশাল আবর্জনার স্তূপ ধসে পাশের অস্থায়ী ঘরবাড়ি ও ঝুপড়ির ওপর পড়ে গেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি ঘটেছে রোববার ২৩ আগস্ট রাজধানীর দার-এস-সালাম এলাকায়। স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে থাকা বিশাল বর্জ্যের স্তূপটি হঠাৎ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আবর্জনার নিচে চাপা পড়ে যায় আশপাশের বেশ কয়েকটি বসতঘর।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে স্থানীয় এক নারীর বক্তব্যে। তিনি জানিয়েছেন, আবর্জনার স্তূপ ধসে তার পাঁচ সন্তানই মারা গেছে।
একটি পরিবারের পাঁচ সন্তানের একসঙ্গে প্রাণ হারানোর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুর্ঘটনার পর স্বজনেরা প্রিয়জনদের খোঁজে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। কেউ অপেক্ষা করছেন কোনো জীবিত মানুষকে উদ্ধারের আশায়, আবার কেউ খুঁজছেন নিখোঁজ স্বজনের মরদেহ।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আরও ২২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উদ্ধারকারীদের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। বিশাল পরিমাণ আবর্জনা, বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়া মাটি এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
গিনি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার আগে পুরো রাতজুড়ে ভারী বৃষ্টি হয়েছিল। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আবর্জনার স্তূপের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে ধস শুরু হলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য আশপাশের বসতিতে আছড়ে পড়ে। ঘুমন্ত মানুষজন নিজেদের সামলে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই অনেকে আবর্জনার নিচে চাপা পড়েন।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সামরিক বাহিনীসহ বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকর্মী সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে খননযন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান চলার সময় ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কারও স্বজন নিখোঁজ, আবার কেউ আশায় রয়েছেন যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপে খননযন্ত্র দিয়ে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে। প্রতিটি স্তর সরানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে কোনো মরদেহ কিংবা জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি দেখতে এবং উদ্ধার অভিযান তদারকি করতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন গিনির প্রধানমন্ত্রী মামাদু উরি বাহ।
স্থানীয় নেতা লানসিনে সিলা এর আগে বার্তাসংস্থা এএফপিকে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ১৮টি মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে।পরবর্তী সময়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩০ জনে পৌঁছেছে।
এই দুর্ঘটনার পেছনে শুধু ভারী বৃষ্টিকে দায়ী করলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এই বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিপুল পরিমাণ আবর্জনা জমে বিশাল স্তূপ তৈরি হওয়া এবং এর আশপাশে মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ভারী বৃষ্টির সময় এমন বিশাল বর্জ্যের স্তূপ অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। পানি জমে গেলে কিংবা মাটি নরম হয়ে গেলে স্তূপের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তখন বড় ধরনের ধস নেমে আশপাশের বসতিগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
কোনাক্রির এই দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এর সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, নিরাপদ আবাসন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একই জায়গায় এমন দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়।২০১৭ সালেও একই স্থানে আবর্জনার স্তূপ ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
সাত বছরের বেশি সময় পর একই ধরনের আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, আগের ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, কেন ওই এলাকার মানুষ এখনো এমন বিপজ্জনক পরিবেশের কাছাকাছি বসবাস করছেন।
একই স্থানে বারবার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার অর্থ হলো সমস্যাটি শুধু এক রাতের ভারী বৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
একদিকে চলছে স্বজনদের অপেক্ষা, অন্যদিকে উদ্ধারকর্মীদের নিরন্তর তল্লাশি। প্রতিটি মুহূর্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোনাক্রির এই দুর্ঘটনা গিনির জন্য আবারও একটি কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। ভারী বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসবাসের মতো বিষয়গুলো পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু সেই অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ মূল্য সামনে এনেছে। একই পরিবারের পাঁচ সন্তানের মৃত্যু ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধার, আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। একই সঙ্গে ২০১৭ সালের পরও কেন একই ঝুঁকি থেকে গেল, সেটির জবাব খুঁজে বের করাও গুরুত্বপূর্ণ।

