প্লাস্টিক দিয়ে বিস্কুট তৈরি— শুনতে অদ্ভুত বা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও বাস্তবে এমনই একটি চমকপ্রদ উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছেন একদল বিজ্ঞানী ও খাদ্য গবেষক। প্লাস্টিক বর্জ্যকে রূপান্তরিত করে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য তৈরির এই পদ্ধতির প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে কুকি বা বিস্কুট দিয়ে। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থার অর্থায়নে চলছে এই গবেষণা প্রকল্প।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— প্লাস্টিক তো সরাসরি খাওয়া অসম্ভব, কারণ এটি মানবদেহের জন্য বিষাক্ত। এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা ব্যবহার করছেন একটি উন্নত জৈব পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে প্লাস্টিককে ধাপে ধাপে খাদ্য-উপযোগী উপাদানে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটি নামের একটি অত্যন্ত প্রচলিত প্লাস্টিক, যা সাধারণত কোমল পানীয় বা পানির বোতলসহ নানা একবার-ব্যবহারযোগ্য পণ্যে দেখা যায়। এই প্লাস্টিকের সঙ্গে ফেলে দেওয়া ভুট্টাগাছের ডাঁটা, পাতাসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ বর্জ্য মিশিয়ে একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি ও অক্সিজেন ব্যবহার করে কঠিন উপাদানগুলোকে ভেঙে অতিক্ষুদ্র যৌগে পরিণত করা হয়— যা পরবর্তীতে অণুজীব সহজেই গ্রহণ করতে পারে।
এরপরের ধাপে সেই ভাঙা যৌগের সঙ্গে যুক্ত করা হয় বিশেষভাবে জিনগতভাবে প্রস্তুত করা ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট। এই অণুজীবগুলো প্লাস্টিক থেকে তৈরি সেই উপজাত গ্রহণ করে তা রূপান্তরিত করে নিরাপদ ও পুষ্টিকর জৈব পদার্থে, যাতে থাকে প্রোটিন, চর্বি এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শর্করা। এই পদার্থকে পরে পেস্টে রূপান্তরিত করে পরিশোধন ও স্বাদ যুক্ত করা হয়, এরপর থ্রিডি ফুড প্রিন্টারের সাহায্যে স্তরে স্তরে সেই পেস্ট দিয়ে তৈরি করা হয় পরিচিত খাবারের আকৃতি— যেমন কুকি। সবশেষে বেকিং বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সেটিকে শক্ত করে খাওয়ার উপযোগী করা হয়।
এই গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অণুজীববিজ্ঞানী। তিনি জানান, তার গবেষণাগারের মূল কাজ ছিল প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে বিভিন্ন মূল্যবান পণ্যে রূপান্তরের প্রযুক্তি নিয়ে। একপর্যায়ে তারা ভাবতে শুরু করেন, এই একই প্রযুক্তি খাদ্য উৎপাদনেও কাজে লাগানো সম্ভব কি না— কারণ প্লাস্টিক এবং খাদ্য, দুটোই মূলত কার্বনভিত্তিক উপাদান দিয়ে গঠিত।
তবে মজার বিষয় হলো, নিজেদের তৈরি এই কুকি এখনো পর্যন্ত নিজেরাই খেয়ে দেখেননি গবেষকরা। মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনো না পাওয়ায় স্বাদ যাচাই করা সম্ভব হয়নি, যদিও কুকির ঘ্রাণ নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। গত সোমবার (২৪ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে একটি রসায়ন বিষয়ক সংগঠনের সম্মেলনে এই গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নভোচারীদের জন্যই কেন এই বিশেষ খাবার নিয়ে এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? পৃথিবীর সাধারণ মানুষের কাছে প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবারের ধারণা গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়তো সহজ নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে করছেন গবেষকরা। বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহে ভ্রমণ বা সেখানে ভবিষ্যতে মানববসতি গড়ে তোলার মতো দীর্ঘ অভিযানে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় এটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
গবেষণা দলের প্রধান জানান, একজন নভোচারীর মঙ্গল গ্রহে যাওয়া ও ফিরে আসতে প্রায় তিন বছরের মতো সময় লাগতে পারে। এত দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রায় সঙ্গে থাকা প্রতিটি উপকরণকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো জরুরি হয়ে পড়ে। এই প্রযুক্তি সফল হলে মহাকাশযানে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্লাস্টিক প্যাকেজিং বা সরঞ্জামের মোড়ককে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যে রূপান্তর করা সম্ভব হতে পারে।
শুধু মহাকাশেই নয়, পৃথিবীর প্রতিকূল পরিবেশেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা— যেমন দীর্ঘদিন সাবমেরিনে অবস্থানরত নাবিকদের খাদ্য সরবরাহ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত এলাকায় জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে।
গবেষক দলের প্রধানের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে ছাপ্পান্ন শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ত্রিশ শতাংশ মানুষ খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার বিশ্বাস, এই আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অণুজীবভিত্তিক এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তবে বর্তমানে এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়ে গেছে, কারণ প্রতি কেজি এই বিশেষ কুকি উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ষাট মার্কিন ডলারের কাছাকাছি— যা এখনো বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে গবেষকরা আশাবাদী, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি টেকসই খাদ্য উৎপাদনের একটি নতুন ও কার্যকর পথ খুলে দিতে পারে, যা শুধু মহাকাশ অভিযানই নয়, বরং পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংকট মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

