যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন বড় ধরনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মুখে। মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। গতকাল মঙ্গলবার দেশটি এ সিদ্ধান্ত জানায়। নতুন শুল্ক আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য সংঘাত আরও এক ধাপ এগোল।
কানাডার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি। গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেন। এর পরই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেন। শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তুতিই এখন বাস্তব রূপ পেল। অটোয়ার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ এবং ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় পড়বে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, মাছসহ বিভিন্ন শিল্প ও ভোগ্যপণ্য। হিমায়িত ও টাটকা মাছ, পনির, ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন এবং রেলপথ নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীও নতুন শুল্কের তালিকায় রয়েছে।
কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম। এসব মার্কিন পণ্যের ওপর আগের ২৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি গৃহস্থালি সরঞ্জাম, পনিরের মতো দুগ্ধজাত পণ্য এবং কিছু বিশেষ ধরনের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মতো কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ।
২০২৪ সালের আমদানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় আসা মোট পণ্যের প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ নতুন এই শুল্কের আওতায় পড়বে। সংখ্যাটি মোট আমদানির তুলনায় খুব বড় না হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু সরাসরি শুল্কের আওতাভুক্ত পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যেসব শিল্প এসব পণ্য কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও চাপতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে কানাডার যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাদের জন্য ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার। অর্থমন্ত্রী শ্যাম্পেন পরিস্থিতিকে কানাডার ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সক্ষমতা কানাডার রয়েছে।
দেশীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি। তিনি নতুন মিত্র ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প যদি কানাডায় তৈরি গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেন, তাহলে কানাডাও এর কঠোর জবাব দেবে।
গাড়ি শিল্প নিয়েই এখন দুই দেশের বাণিজ্য সংঘাতের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি উৎপাদনব্যবস্থা বহু বছর ধরে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে দুই দেশের সীমান্ত একাধিকবার অতিক্রম করতে হয়। ফলে গাড়ির ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ হলে শুধু কানাডার উৎপাদক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপ্রতিষ্ঠানও পরোক্ষভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এর মধ্যেই সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সাল থেকে কানাডীয় গাড়ির ওপর শুল্ক বর্তমানের ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কানাডার গাড়ি শিল্পে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত গাড়ির দামও বাড়তে পারে।
শেষ মুহূর্তে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্পের নতুন শুল্কের ধাক্কা পড়েছে কানাডার প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর। এই অংক যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ শুল্ক বাড়লে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে একটি পণ্যের সঙ্গে যুক্ত অন্য শিল্পগুলোও ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়তে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির তোয়াক্কা করছে না। এর ফলে কানাডার রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর শুল্ক হার ৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াবে। প্লাস্টিক, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং কাঠ ও কাগজ শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে কুইবেক, নিউ ব্রান্সউইক এবং অন্টারিওর উৎপাদকদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কানাডার অর্থনীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে, এ বছর পণ্য বাণিজ্যের হিসাবে মেক্সিকোর পর কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে দুই দেশের অর্থনীতি এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব একতরফাভাবে কোনো একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।
অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কানাডীয় সরকারের বাণিজ্য আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। তবে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে তাদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগও রয়েছে। এই দ্বৈত মনোভাব বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতাই তুলে ধরে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াকে অনেক কানাডীয় জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘ হলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দেশের ব্যবসা ও সাধারণ মানুষকেই দিতে হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, কানাডা মার্কিন মদ, গাড়ি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করেছে। এই অভিযোগকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অবস্থানে তারা নেই।
তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলছে, পাল্টাপাল্টি শুল্ক দিয়ে দীর্ঘদিন চলা এই সংঘাত দুই দেশের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। একটি দেশ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ালে অন্য দেশও একই পথে হাঁটে। এতে সরকার হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে, কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়।
কানাডার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো। দেশটি নতুন মিত্র ও বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজতে চাইছে। কিন্তু বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার কাঠামো দ্রুত পরিবর্তন করা সহজ নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও কানাডার কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও শিল্পপণ্যের বিকল্প উৎস তৈরি করতে গেলে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের মুখে পড়বে।
তাই বর্তমান শুল্কযুদ্ধকে শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা, ভোক্তা মূল্য এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক। বিশেষ করে ২০২৭ সাল থেকে কানাডীয় গাড়ির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই পাল্টাপাল্টি শুল্ক কোথায় গিয়ে থামবে। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা না হলে আরও পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আসতে পারে এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও দুর্বল হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত উভয় দেশকেই বিকল্প বাজার ও নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রতিবেশী নয়, তারা পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল অর্থনৈতিক অংশীদারও। ফলে একজনকে চাপে ফেলতে গিয়ে অন্য পক্ষও ক্ষতির বাইরে থাকতে পারবে না। কানাডার নতুন পাল্টা শুল্ক সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন দুই দেশের জন্য বড় পরীক্ষা হবে—কে কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে, তা নয়; বরং কীভাবে এমন একটি সমাধানে পৌঁছানো যায়, যাতে বাণিজ্য সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে শিল্প, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি না করে।

