চীন এমন একটি নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র তৈরি করেছে, যা দেশটির ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার, আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্টগুলো এই অস্ত্রের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
চীনা সূত্রের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, চীনের সামরিক বাহিনী এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV) তৈরি করেছে, যা আকাশ থেকে আকাশে হামলার অস্ত্র বহন করতে পারে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সংঘাত শুরু হলে এ ধরনের অস্ত্র মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান করা মার্কিন সামরিক বিমানগুলোও এতে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এসব বিমানের মধ্যে রয়েছে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার, আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট। এমনকি মার্কিন বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ই-৪বি নাইটওয়াচ বিমানও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
নতুন অস্ত্রে কী থাকছে
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, চীন তার কিছু হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রেও আকাশ থেকে আকাশে হামলার সক্ষমতা যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও যোগ করা হয়েছে।
এর ফলে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা শুধু স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তু বা জাহাজে হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দূরপাল্লার বিমান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আকাশভিত্তিক সামরিক সম্পদও ভবিষ্যতে এসব অস্ত্রের আওতায় আসতে পারে।
চীনের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের কাছে অন্তত ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।
কীভাবে কাজ করে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল
হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল মূলত এমন একটি ওয়ারহেড, যা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণের পর বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে চলতে পারে। প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—উড্ডয়নের সময় এটি গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
এই গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতার কারণে শত্রুপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এর গতিবিধি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং সঠিকভাবে প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনের ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এই পাল্লা চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের দূরত্বের কাছাকাছি।
আরও উন্নত ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। সে হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, এমনকি হাওয়াই পর্যন্ত এর আওতায় আসতে পারে।
দূরের বিমানকে আঘাত করা কতটা কঠিন
তবে এত দূরে থাকা কোনো চলন্ত বিমানকে ব্যালিস্টিক বা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা সহজ কাজ নয়।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে সর্বোচ্চ পাল্লায় পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। এ সময়ে লক্ষ্যবস্তু একটি বিমান ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকে। ফলে হামলা সফল করতে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভুল ও হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য প্রয়োজন।
এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। কোনো বড় সামরিক সংঘাতের সময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে প্রতিপক্ষ ভুল করে পারমাণবিক হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এতে একটি প্রচলিত হামলাও দ্রুত বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা
চীনের ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকীকরণ কর্মসূচিতে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং প্রতিপক্ষের সামরিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশে সমন্বিতভাবে আঘাত করার সক্ষমতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, চীনের সামরিক আধুনিকীকরণে এই ধরনের সমন্বিত হামলার সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১৪৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
অর্থাৎ গত এক দশকে চীন শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ায়নি, এর সামগ্রিক মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
পাল্টা সক্ষমতা গড়ছে যুক্তরাষ্ট্রও
দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে হামলার অস্ত্রের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের সক্ষমতা উন্নয়নের চেষ্টা করছে।
মার্কিন নৌবাহিনী সম্প্রতি এআইএম-৪২৪ ম্যালিস নামের একটি নতুন আকাশ থেকে আকাশে হামলার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। এর পাল্লা ৩০০ মাইলের বেশি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতে শুধু যুদ্ধবিমান বনাম যুদ্ধবিমানের লড়াই নয়, বরং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা ট্যাংকার, নজরদারি বিমান, কমান্ড পোস্ট এবং অন্যান্য সহায়ক সামরিক বিমানও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
চীনের নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র সেই পরিবর্তনশীল যুদ্ধকৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এ ধরনের অস্ত্র কার্যকরভাবে মোতায়েন করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সুবিধা—দূরে অবস্থান করেও বিমান অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা—নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

