ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে এমন একটি দেশের ওপর, যার নাম ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে খুব বেশি উচ্চারণ করতে চাইছে না—চীন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যখন নতুন অর্থনৈতিক অভিযান ঘোষণা করে সতর্ক করেন যে, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে তারা কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে, তখন তিনি সরাসরি চীনের নাম নেননি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের অর্থনীতিকে বাইরের চাপের মধ্যেও সচল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বেইজিং।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন বহু বছর ধরে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গত বছর ইরানের রপ্তানি করা তেলের বিপুল অংশই কিনেছে চীন, যার মূল্য ছিল কয়েক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। তেলের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যও রয়েছে।
ফলে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও যদি ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে অর্থনৈতিকভাবে আরও কঠোর চাপ সৃষ্টি করে তেহরানকে নত করা সম্ভব, তাহলে তাকে চীনের ভূমিকা বিবেচনায় নিতেই হবে।সমস্যা হচ্ছে, বেইজিংকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানতে চায় না চীন
চীন বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে এসেছে।ইরান বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ওয়াশিংটনের নির্দেশে সীমিত করতে হবে—এই ধারণা বেইজিং গ্রহণ করে না।
স্কট বেসেন্টের সংবাদ সম্মেলনের পর মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে নিজেদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বেইজিং।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং সর্বোচ্চ চাপ কোনো সমস্যার সমাধান করবে না। বরং এতে উত্তেজনা ও সংঘাত আরও বাড়বে, ঝুঁকি অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হবে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক চাপকে বেইজিং শুধু ইরানবিষয়ক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। চীনের দৃষ্টিতে এটি এমন একটি নজির তৈরি করতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ঠিক করে দেবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কোন দেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে আর কোন দেশের সঙ্গে পারবে না।
আগামী মাসের শীর্ষ বৈঠকও বড় হিসাব
এই উত্তেজনার মধ্যেই আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে।দুই দেশের জন্যই এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ চলতি বছরের শেষ দিকে যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সাময়িক সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা, সেটি আরও বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ অগ্রগতি করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সফর বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ১১ বছরের মধ্যে শি জিনপিংয়ের প্রথম রাষ্ট্রীয় যুক্তরাষ্ট্র সফর।
তাই ইরানকে কেন্দ্র করে এমন কোনো অর্থনৈতিক সংঘাত তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ট্রাম্প ও শির আসন্ন বৈঠকে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, মে মাসে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি ইরান প্রশ্নে চীনা নেতার কাছে কোনো বিশেষ সহায়তা চাননি।
এই বক্তব্য সঠিক হলে বেইজিং হয়তো ধরে নিতে পারে, যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর এখন যখন ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে চাইছে, তখন চীনের প্রয়োজনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।
চীনের কাছে বিষয়টি শুধু ইরান নয়
চীনা বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের জন্য মূল প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের নিষেধাজ্ঞাকে ব্যবহার করে চীনের তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
সাংহাইয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ঝাও লংয়ের মতে, চীন এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম, যেখানে ওয়াশিংটন ঠিক করবে চীনা প্রতিষ্ঠান কোন তৃতীয় দেশের সঙ্গে আইনসম্মতভাবে বাণিজ্য করতে পারবে।
কারণ একবার এই নজির প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করে চীনের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে।
অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্যের প্রশ্নটি বেইজিংয়ের কাছে শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক স্বাধীনতার প্রশ্নও।
কীভাবে চীনে পৌঁছায় ইরানের তেল
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনে ইরানের তেল পৌঁছানোর জন্য বহু বছর ধরে একটি জটিল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।এই ব্যবস্থার বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক কাঠামো থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
চীনের ছোট বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেল কিনে প্রক্রিয়াজাত করে।
এই লেনদেনে এমন বন্দর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং তেলবাহী জাহাজ ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় করা ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে চীন বহু বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে এসব ইরানি তেল কেনার তথ্য দেখায়নি।
এ কারণেই শুধু সাধারণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই বাণিজ্য বন্ধ করা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন।
তবু চাপ দেওয়ার জায়গা আছে
চীনের তেল কেনার পুরো ব্যবস্থাই যে মার্কিন চাপ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ, তা নয়।ওয়াশিংটনের কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, তেল কেনার সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানার কাঠামো খুঁজলে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে বড় চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
আর সেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই মার্কিন ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি ছোট সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে তাদের মূল মালিক প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তখন বড় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে—ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত সহযোগী প্রতিষ্ঠান ধরে রাখবে, নাকি মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার রক্ষা করবে।
চীনের দুটি ব্যাংককে আগেই সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন
চাপের এই কৌশল ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।স্কট বেসেন্ট চলতি বছরের শুরুতেই জানিয়েছিলেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দুটি চীনা ব্যাংককে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যেসব চীনা ব্যাংক বা জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান মার্কিন নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কী করবে।
বেসেন্টের উত্তর ছিল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঊর্ধ্বে কেউ নয়।এই বক্তব্য কঠোর হলেও বেইজিং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে পিছু হটেছে।
আর চীনের হাতে এমন কিছু পাল্টা অর্থনৈতিক অস্ত্র রয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করে।
চীনের বড় শক্তি বিরল খনিজ
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরির জায়গাগুলোর একটি হলো বিরল খনিজ।বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
এসব খনিজ আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, গাড়ি, অর্ধপরিবাহী এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে ব্যবহৃত হয়।ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় কোনো চীনা ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, বেইজিং পাল্টা বিরল খনিজ বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে।
তাতে ক্ষতি শুধু চীনের হবে না; মার্কিন শিল্প ও প্রযুক্তি খাতও সমস্যায় পড়তে পারে।এই পারস্পরিক নির্ভরতাই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি।
বড় চীনা ব্যাংকে নিষেধাজ্ঞা দিলে কী হতে পারে
বেইজিংয়ের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক সুন চেংহাও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় চীনা ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর্যায়ে যায়, তাহলে চীন প্রায় নিশ্চিতভাবেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
এতে ট্রাম্প ও শির আসন্ন বৈঠকের পরিবেশও দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে।তার মতে, এমন পদক্ষেপে বৈঠক সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে এমন নয়।
কিন্তু বৈঠকের মূল লক্ষ্য যদি দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বদলে গিয়ে ক্ষতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়—সেই আলোচনায় পরিণত হতে পারে।
অর্থাৎ ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বৃহত্তর হিসাবও করতে হচ্ছে।
বেইজিং কি গোপনে কিছু ছাড় দিতে পারে
চীন প্রকাশ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইবে না।কারণ এতে এমন বার্তা যাবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে বেইজিং নিজের ইরান নীতি বদলেছে।
তবে তার মানে এই নয় যে চীন কোনো ধরনের সমন্বয় করবে না।বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং চাইলে নীরবে ইরানি তেল কেনা কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।একই সঙ্গে তেহরানের কাছে রাজনৈতিক বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিয়ে সংযম দেখাতে চাপ দিতে পারে।
চীনের জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ অনেক বেশি সুবিধাজনক হতে পারে, কারণ এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়ানো যাবে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কাছে নতি স্বীকারও করতে হবে না।
ইতোমধ্যে কমেছে ইরানি তেল কেনা
চীনের ইরানি তেল কেনা গত বছরের তুলনায় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।এর অন্যতম কারণ মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়া।
তাই তেল আমদানির হ্রাসকে শুধু মার্কিন কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা যাবে না। যুদ্ধ ও পরিবহন সংকটও এতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে।চীন যদি তেল কেনা আরও কমিয়ে দেয়, তাহলে ইরানের বৈদেশিক আয়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের স্বার্থের মিল
ইরান প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মতপার্থক্য গভীর হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের স্বার্থ মিলছে।দুই দেশই চায় হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল ফিরে আসুক।
যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন নিজেও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির বড় আমদানিকারক।
ফলে দীর্ঘ সময় এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা চললে চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।এই কারণেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেইজিং বারবার সংযম ও হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারের কথা বলছে।
জর্ডানের বাদশাহর সঙ্গে বৈঠকেও একই বার্তা
সোমবার বেইজিংয়ে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে শি জিনপিং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে তিনি সংঘাতের একটি সামগ্রিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়াও দেইউও জানান, শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে চীন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এই বক্তব্যগুলো দেখায়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া বেইজিংয়ের স্বার্থেও নয়।তবে চীন যে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেবে, তার লক্ষণ এখনো নেই।
সরাসরি মধ্যস্থতায় আগ্রহ কম বেইজিংয়ের
ইরান সংঘাতে চীন এখন পর্যন্ত তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।বেইজিং এমন ভাবমূর্তি তৈরি করতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো চাপ ও সামরিক অবস্থান বদলানোর বদলে চীন একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে আঞ্চলিক শান্তি ও বাণিজ্যের পক্ষে রয়েছে।
এই কারণে তারা শান্তি আলোচনার পক্ষে কথা বললেও সরাসরি এমন কোনো ভূমিকায় যেতে চায় না, যেখানে মনে হবে চীন ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে ইরানকে চাপ দিচ্ছে।
ঝাও লংয়ের মতে, আঞ্চলিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতাকে শুধু ট্রাম্পকে সুবিধা দেওয়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।বেইজিং সংকট শেষ করতে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী, কিন্তু ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশলের হাতিয়ার হতে চায় না।
ট্রাম্পের সামনে কঠিন সমীকরণ
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করতে চাইলে চীনের তেল কেনা কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু চীনকে জোর করে সেই পথে নিয়ে যেতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন নিষেধাজ্ঞা দিতে হতে পারে, যা দুই দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ককেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
আবার অতিরিক্ত চাপ দিলে চীনও পাল্টা বিরল খনিজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মার্কিন অর্থনীতিকে চাপ দিতে পারে।এর সঙ্গে রয়েছে আগামী মাসের ট্রাম্প-শি বৈঠক এবং চলতি বছরের শেষ দিকে শেষ হতে যাওয়া বাণিজ্যিক সাময়িক সমঝোতা।
ফলে ইরান প্রশ্নে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও ওয়াশিংটনের সামনে চীনকে পুরোপুরি প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলার সুযোগ খুব সীমিত।
চীনেরও নিজস্ব হিসাব আছে
অন্যদিকে চীনও ইরানকে অন্ধভাবে সমর্থন করবে এমন নয়।বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্কের আকার অনেক বড়।
একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ চললে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হবে, তা চীনের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।
তাই চীন সম্ভবত এমন একটি অবস্থান ধরে রাখতে চাইবে যেখানে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় থাকবে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বড় অর্থনৈতিক সংঘাতে যেতে হবে না।
শেষ পর্যন্ত চাবিকাঠি কোথায়
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক কৌশলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই।
ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, ব্যাংককে সতর্ক করতে পারে, জাহাজ ও প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকায় ফেলতে পারে। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি না হয়, তাহলে তেহরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন।
আবার চীনকে বাধ্য করতে গিয়ে যদি ওয়াশিংটন এমন ব্যবস্থা নেয়, যা বড় চীনা ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি আঘাত করে, তাহলে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত খুব দ্রুত চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আর সেই সংঘাতের প্রভাব শুধু তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।বিশ্বের তেলবাজার, জাহাজ চলাচল, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন আসল প্রশ্ন শুধু ইরানের ওপর কতটা চাপ দেওয়া যায়, সেটি নয়।আরও বড় প্রশ্ন হলো—ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে কতটা সংঘাতে যেতে প্রস্তুত।
বেইজিংয়েরও একই ধরনের হিসাব করতে হচ্ছে। তারা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে কত দূর যাবে, আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও নিজেদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় কোথায় গিয়ে সীমা টানবে।
আগামী মাসের ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে তাই ইরান শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংকট নয়; এটি বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির সম্পর্কেরও নতুন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

