ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি জীবিত আছেন কি না—এই প্রশ্ন এখন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার কোনো সাম্প্রতিক ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠবার্তাও প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের বহু ব্যক্তিও তাকে সরাসরি দেখেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যেই তার কার্যালয় থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ ও বিবৃতি কমে গেছে। ফলে মুজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আগে থেকেই চলতে থাকা জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। কেউ বলছেন নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে সম্পূর্ণ গোপনে রাখা হয়েছে, আবার সরকারঘনিষ্ঠ কিছু সূত্রের দাবি—ফেব্রুয়ারিতে পাওয়া আঘাতের কারণে তার অবস্থা গুরুতর হয়ে থাকতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুজতবা খামেনি সত্যিই অসুস্থ, মৃত নাকি নিরাপত্তার কারণে আত্মগোপনে—এর কোনো দাবিই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বরং এই অনিশ্চয়তাই এখন ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাবার স্মরণানুষ্ঠানেও অনুপস্থিত
গত মঙ্গলবার ইরানের রাজধানী তেহরানের সবচেয়ে বড় মসজিদে মুজতবা খামেনির বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আয়োজক হিসেবে মুজতবার নাম থাকলেও তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি আলী খামেনির কয়েকজন ছেলেও সেখানে ছিলেন। অথচ যার নামে অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক আয়োজন, সেই মুজতবার অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে তার সাম্প্রতিক কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য আব্বাস আরাঘচিসহ শীর্ষ পর্যায়ের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিই তাকে দেখেননি।
লন্ডনভিত্তিক বিরোধী সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুজতবা সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যই তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেননি।
সাবেক কর্মকর্তা এবং মুজতবার আত্মীয় মোহাম্মদ হোসেইন খোশভাক্তের দাবি, ক্ষমতা গ্রহণের পর পাঁচজনেরও কম ব্যক্তি তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা নাকি গুরুতর অসুস্থতা?
মুজতবার জনসমক্ষে না আসার পেছনে নিরাপত্তার যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবা যে ধরনের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাতে মুজতবাও ইসরায়েলি বা মার্কিন হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে তার অবস্থান গোপন রাখা ইরানি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। সরাসরি ভিডিও বা শব্দবার্তা প্রকাশ করা হলে প্রযুক্তিগতভাবে তার অবস্থান সম্পর্কে প্রতিপক্ষ কোনো সূত্র পেতে পারে—এমন আশঙ্কাও থাকতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তার পরিবারের ওপর চালানো হামলায় মুজতবা আহত হয়েছিলেন বলে বলা হচ্ছে। সেই আঘাতের কারণে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দেওয়া কিংবা সরাসরি উপস্থিত হওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকা এবং একই সময়ে তার কার্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া—এই দুই ঘটনা মিলেই সন্দেহ বাড়িয়েছে।
মৃত্যুর গুঞ্জন কেন বাড়ছে
প্রতিবেদনটিতে ইরান সরকারের ভেতরে এবং সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, ফেব্রুয়ারির হামলায় পাওয়া আঘাতের জটিলতায় মুজতবার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
তেহরানের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মনে করেন মুজতবা হয় মারা গেছেন, নয়তো মস্তিষ্কের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরও অন্তত দুই সরকারি কর্মকর্তা একই ধরনের ধারণার কথা জানিয়েছেন।
তাদের একজনের ধারণা, চলতি আগস্ট মাসের শুরুর দিকেই মুজতবার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে অথবা তিনি অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় চলে গিয়ে থাকতে পারেন।
তবে এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। এগুলো মূলত সরকারি মহলের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া ধারণা ও গুঞ্জন। ফলে এগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
মুজতবার জন্য প্রার্থনা ও পশু কোরবানির আহ্বান
সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ছড়িয়ে পড়া একটি জনসম্মুখের আহ্বান। দেশের একটি বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইরানিদের মুজতবার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করতে এবং তার মঙ্গল কামনায় ভেড়া কোরবানি করতে বলা হয়েছিল।
ইসলামি সংস্কৃতিতে কারও বিপদমুক্তি বা সুস্থতার কামনায় এ ধরনের কোরবানির প্রচলন রয়েছে।
ওই আহ্বানে মুজতবার জীবন ‘হুমকির মধ্যে’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কিছু ধর্মীয় ব্যক্তির সতর্কতার কথাও তুলে ধরা হয় যে, তাকে হত্যা করা হতে পারে।
এ ধরনের বার্তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা যদি পুরোপুরি সুস্থ থাকেন, তাহলে তার স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার জন্য এমন প্রকাশ্য আবেদন কেন করা হলো—এই প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই দেখা দিয়েছে।
২৭ জুলাই পর্যন্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত
মুজতবা ক্ষমতায় আসার পর তার কার্যালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত প্রচার করা হয়েছে। ইরানে সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র নন, তিনি ধর্মীয় কর্তৃত্বও বহন করেন।
২৭ জুলাই তার কার্যালয় থেকে ধর্মীয় অনুসারীদের বিভিন্ন ব্যবহারিক প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করা হয়।
এর মধ্যে রক্তক্ষরণ হওয়া মাড়ি নিয়ে খাবার খাওয়ার বিষয়ে একটি প্রশ্নও ছিল। ইসলামে রক্ত নিষিদ্ধ হওয়ায় নিজের মাড়ির রক্ত খাবারের সঙ্গে মিশে গেলে সেই খাবার ফেলে দিতে হবে বলে মুজতবার নামে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়।
এর অর্থ দাঁড়ায়, কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য সত্য হলে অন্তত ২৭ জুলাই পর্যন্ত তিনি ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন।
তবে এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি তার নিজের উপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে কি না, নাকি পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা হয়েছে—প্রতিবেদনটি সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ দেয়নি।
৯ আগস্টের পর হঠাৎ নীরবতা
মুজতবার কার্যালয় থেকে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি আসে ৯ আগস্ট।সেখানে জানানো হয়, তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে বৈঠকটি ঠিক কোন দিনে হয়েছিল, তা বলা হয়নি।
শুধু বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের তৃতীয় বছর উপলক্ষে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে হিসাবে বৈঠকটি ২৮ জুলাই বা তার পরে হয়ে থাকতে পারে।
পেজেশকিয়ান নিজেও ইরানি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি মুজতবার সঙ্গে সাত ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের সংকটে থাকা অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
খোশভাক্তের বক্তব্য অনুযায়ী, পেজেশকিয়ানকে এমনভাবে ওই বৈঠকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে তিনি জানতেন না তাকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মুজতবার অবস্থান অত্যন্ত কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছিল।
একই ৯ আগস্ট মুজতবার নামে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশও প্রকাশ করা হয়। কয়েকজন জেনারেলকে শীর্ষ সামরিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে তার একজন প্রতিনিধিকেও পরিবর্তন করা হয়।কিন্তু এরপর থেকেই তার কার্যালয় কার্যত নীরব।এই নীরবতাই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ঘনিষ্ঠদের দাবি—মুজতবা জীবিত
মুজতবার মৃত্যুর গুঞ্জন জোরালো হলেও তার ঘনিষ্ঠরা তা প্রত্যাখ্যান করছেন।খোশভাক্ত দাবি করেছেন, মুজতবা নিশ্চিতভাবেই জীবিত আছেন। তার মতে, মৃত্যুর গুঞ্জন একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের গুঞ্জনের লক্ষ্য ইরানি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মনোবল দুর্বল করা এবং মার্কিন চাপ ও হুমকির সামনে তাদের নতি স্বীকারে বাধ্য করা।
তিনি আরও মনে করেন, সরকারবিরোধী ইরানিদের রাস্তায় নামার সাহস জোগানোও এ ধরনের প্রচারের উদ্দেশ্য হতে পারে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এবং মুজতবার প্রকাশ্য সমর্থক আবদোলরেজা দাভারিও দাবি করেছেন, মুজতবা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং খুব শিগগিরই তাকে জনসমক্ষে দেখা যাবে।
কিন্তু দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরাসরি যোগাযোগের অনুপস্থিতি, সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আহ্বান এবং সরকারি মহলে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন—সবকিছু মিলিয়ে অনেক ইরানিই এসব আশ্বাস নিয়ে সন্দিহান।
আসল সংকট শুধু মুজতবার স্বাস্থ্য নয়
মুজতবা জীবিত না মৃত—প্রশ্নটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় বিষয় হয়ে উঠছে তার অনুপস্থিতির রাজনৈতিক প্রভাব।
ইরানের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে অতীতে সর্বোচ্চ নেতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতার ভূমিকা পালন করেছেন।
কিন্তু বর্তমানে যখন ইরানকে যুদ্ধ, কূটনীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, তখন সর্বোচ্চ নেতার দৃশ্যমান অনুপস্থিতি একটি শূন্যতা তৈরি করছে।
এই শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতেও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
১৩ সদস্যের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হাতে কার্যত নেতৃত্ব
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের ১৩ সদস্যের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ অনেকটা সমষ্টিগতভাবে দেশ পরিচালনা করছে।
এর সভাপতিত্ব করছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাকে সংস্কারপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান চান।
পরিষদে রয়েছেন প্রভাবশালী পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অন্যদিকে পরিষদে বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল আহমদ ভাহিদিসহ প্রভাবশালী সামরিক নেতারাও রয়েছেন।
ফলে একই কাঠামোর মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানপন্থী এবং অপেক্ষাকৃত কঠোর অবস্থানপন্থী ব্যক্তিদের উপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলতে পারে।
১৩ জনের মধ্যে ১২ জন চুক্তির পক্ষে
গত জুনে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে ১২ জন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের হওয়া সমঝোতা স্মারকের পক্ষে ভোট দেন।
মুজতবা পরে একটি বার্তার মাধ্যমে ওই সমঝোতাকে সমর্থন করেন। তবে তিনি এটাও জানিয়েছিলেন যে, নীতিগতভাবে শুরুতে এমন চুক্তির বিরোধী ছিলেন।এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরানের কট্টরপন্থী অংশ নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু করে।
তাদের অভিযোগ ছিল, গালিবাফ কার্যত ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে সর্বোচ্চ নেতার ওপর সমঝোতা চাপিয়ে দিয়েছেন।
বিপ্লবী গার্ডের একটি অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে ‘গালিবাফের অভ্যুত্থান’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রকাশ করে।
কিন্তু মুজতবা প্রকাশ্যে এই অভিযোগের পক্ষে দাঁড়াননি, আবার তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানও করেননি।ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধামতো তার অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছে।
সর্বোচ্চ নেতার নীরবতায় বাড়ছে ক্ষমতার লড়াই
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুজতবার সঙ্গে বৈঠকে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।কিন্তু বাস্তবে সেই দ্বন্দ্ব থেমে নেই।
গত জুনে সর্বোচ্চ নেতার কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ পরিষদের ৮৮ সদস্যের মধ্যে ৬৩ জন একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলা হয়, মুজতবার ‘সুনির্দিষ্ট মতামতের’ বিরুদ্ধে কাজ করার অধিকার কারও নেই।
একই বিবৃতিতে এমন একটি অত্যন্ত কঠোর আহ্বানও ছিল, যা ইরানের কূটনৈতিক আলোচনার ভাষার সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সুযোগ পেলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এই অবস্থান মুজতবার আগের ‘রক্তের প্রতিশোধ’ সংক্রান্ত বক্তব্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা, অন্যদিকে কঠোর প্রতিশোধমূলক বক্তব্য—ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে দুই বিপরীত প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অনিশ্চয়তাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
মুজতবা খামেনি আসলে কোথায় আছেন এবং তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা কী—তার স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন তিনি জীবিত ও সুস্থ। অন্যদিকে সরকারি মহলের কিছু সূত্র তার গুরুতর অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলছে। কিন্তু কোনো পক্ষের দাবিই এমন প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যা বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে।
আর এখানেই ইরানের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে ঘিরে যখন এত দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা থাকে, তখন শুধু তার ব্যক্তিগত অবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে না; প্রশ্ন ওঠে পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।
ইরান এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন তাকে কূটনীতি ও সংঘাতের মধ্যে ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করতে হচ্ছে। যুদ্ধের চাপ, দুর্বল অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্তই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের চূড়ান্ত রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকেন এবং তার অবস্থান নিয়েই রাষ্ট্রের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্র নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে শুরু করতে পারে।
এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘জীবিত না মৃত’ নয়
মুজতবা খামেনির মৃত্যু নিয়ে যে গুঞ্জন চলছে, সেটিই হয়তো সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন। কিন্তু ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বর্তমানে কতটা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
কারণ তিনি জীবিত থেকেও যদি দীর্ঘ সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকাশ্য প্রক্রিয়া থেকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তার প্রভাব দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আবার মৃত্যুর গুঞ্জন যদি পুরোপুরি ভিত্তিহীনও হয়, দীর্ঘ নীরবতা নিজেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মুজতবা খামেনির একটি বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য প্রকাশ্য উপস্থিতি শুধু তার স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন থামানোর জন্য নয়, ইরানের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ততদিন পর্যন্ত মুজতবাকে ঘিরে প্রশ্নটি তেহরানের রাজনৈতিক আলোচনায় থেকেই যাবে—তিনি কোথায়, কেমন আছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ইরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন আসলে কে নিচ্ছেন?

