বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গাড়ি, বিদ্যুৎচালিত যান, শক্তিশালী চুম্বক, অর্ধপরিবাহী শিল্প ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের পেছনে এমন কিছু খনিজ রয়েছে, যেগুলো সাধারণ মানুষের আলোচনায় খুব বেশি আসে না। অথচ এসব খনিজের সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বিশ্বের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন থমকে যেতে পারে।
এই খনিজগুলোর বড় একটি অংশের উৎপাদন ও বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাতকরণ এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে বিশ্বের বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮৫ শতাংশ চীনের হাতে। মোট ১৭টি মৌলকে সাধারণভাবে বিরল খনিজের শ্রেণিতে রাখা হয়। এর মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া ভারী বিরল খনিজগুলো আধুনিক শিল্পের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই অবস্থান চীনকে এমন এক অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েছে, যা প্রয়োজনে কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে প্রশ্ন হলো, চীন কি কয়েক দশক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এই অবস্থান তৈরি করেছিল?
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। আজকের চীনা আধিপত্য কোনো একক দীর্ঘমেয়াদি গোপন পরিকল্পনার ফল নয়। বরং অভ্যন্তরীণ শিল্পনীতি, সস্তা উৎপাদন, পরিবেশের ক্ষতি মেনে নেওয়া, স্থানীয় সরকারের প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংঘাত—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
১৯৯২ সালের একটি বক্তব্য এখন নতুন অর্থ পাচ্ছে
১৯৯২ সালে চীনের নেতা দেং শিয়াওপিং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সঙ্গে চীনের বিরল খনিজ সম্পদের তুলনা করেছিলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার সেই বক্তব্য আবার ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। অনেকের ধারণা, দেং হয়তো তখনই বুঝেছিলেন যে ভবিষ্যতে বিরল খনিজকে ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সংঘাতের সময় চীন যখন বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু করে, তখন এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়।
গত নভেম্বরে চীন বিরল খনিজ রপ্তানির জন্য অনুমতির ব্যবস্থা চালু করার পর যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই বলতে শুরু করেন, কয়েক দশক আগে যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, চীন এখন সেটিকেই বাস্তবে কাজে লাগাচ্ছে।
কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীনের এই আধিপত্যের যাত্রা ছিল অনেক বেশি এলোমেলো, ধীর এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ভরা।
বিরল খনিজ আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ
বিরল খনিজের বাজার আকারে খুব বড় নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি।
অর্ধপরিবাহী, সামরিক প্রযুক্তি, গাড়ি, বিদ্যুৎচালিত যান, শক্তিশালী চুম্বক, বায়ু বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদনে এসব খনিজ প্রয়োজন হয়।
সমস্যা হলো, এসব খনিজ পৃথিবীতে একেবারে দুর্লভ নয়। কিন্তু লাভজনকভাবে উত্তোলন করা যায় এমন ঘনত্বে এগুলো পাওয়া তুলনামূলক কঠিন। তার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়াজাতকরণ।
বিরল খনিজ আলাদা করা অত্যন্ত জটিল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আকরিক প্রক্রিয়াজাত করার সময় তেজস্ক্রিয় দূষকযুক্ত পানি বের হতে পারে। এতে শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আশপাশের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য চীনে এই শিল্প চলে যাওয়া সুবিধাজনক ছিল। এতে একদিকে খনিজের দাম কমেছে, অন্যদিকে দূষণ ও পরিবেশগত ক্ষতির বড় অংশ চীনের ভেতরেই থেকে গেছে।
এই সুবিধাই পরবর্তীতে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নির্ভরতার বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
১৯৫০-এর দশক থেকেই ভিত্তি তৈরি
চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার বায়ান ওবো খনি ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে দেশটির বিরল খনিজ শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এখনো সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিচিত বিরল খনিজের মজুত রয়েছে।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ চীনের জিয়াংসি ও গুয়াংডং প্রদেশে আরও খনিজের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে এই অঞ্চলগুলো ভারী বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।তবে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে।
চীনা রসায়নবিদ সু গুয়াংশিয়ান বিরল খনিজগুলোকে একে অপরের কাছ থেকে আলাদা করার একটি নতুন ও তুলনামূলক কম খরচের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
ঠিক একই সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্ধপরিবাহী শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। ফলে বিরল খনিজের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের চাহিদাই বাড়তে থাকে।
১৯৮২ সালে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
১৯৮২ সালে দেং শিয়াওপিং এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ফাং ই বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেন।তবে তখন সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল ভূরাজনৈতিক আধিপত্য নয়। বরং বেশি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা।
এ কারণে ১৯৮০-এর দশকে চীন বিরল খনিজ শিল্পে তুলনামূলক শিথিল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।ছোট ছোট খনি দ্রুত গড়ে ওঠে। উৎপাদন ছিল সস্তা, কিন্তু পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বেশিরভাগ খনিজ রপ্তানি হতো জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে।ফলাফলও দ্রুত আসে।১৯৮৬ সালের মধ্যে চীনের বিরল খনিজ উৎপাদন ১৯৭৮ সালের তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি হয়ে যায়।
এরপর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ উৎপাদক হয়ে ওঠে চীন।
সস্তা খনিজে লাভবান হয়েছিল পশ্চিমও
বর্তমানে অনেকেই চীনের বাজার দখলকে একতরফাভাবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও এই ব্যবস্থায় যথেষ্ট লাভবান হয়েছিল।
চীনে উৎপাদন খরচ কম ছিল। একই সঙ্গে কঠিন পরিবেশবিধি না থাকায় খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও কম রাখা সম্ভব হয়েছিল।
ফলে পশ্চিমা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় খনিজ পেতে থাকে।অন্যদিকে খনি থেকে সৃষ্টি হওয়া দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতি বহন করতে হয়েছে চীনকেই।
১৯৯০ সালে কৌশলগত সম্পদের স্বীকৃতি
১৯৯০ সালে চীন বিরল খনিজকে সুরক্ষিত ও কৌশলগত খনিজ হিসেবে ঘোষণা করে।এরপর খনিজ অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত করতে শুরু করে দেশটি।
কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার বড় ব্যবধান ছিল।স্থানীয় সরকারগুলো কর আদায় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যত বেশি সম্ভব উৎপাদনে আগ্রহী ছিল। ফলে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থেকে যায়।
অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দেশের ভেতরেই মূল্যযুদ্ধ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও চীনা খনিজ খুব কম দামে বিক্রি হতে থাকে।
পরিবেশের মূল্য ছিল ভয়াবহ
এই দ্রুত শিল্পায়নের মূল্য চীনকে পরিবেশ দিয়ে দিতে হয়েছে।হলুদ নদীর উত্তরে থাকা বাওগাং বর্জ্য বাঁধে প্রায় ২০ কোটি টন দূষিত পদার্থ জমা হয়েছিল। জায়গাটি পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ বর্জ্য হ্রদ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে জিয়াংসি প্রদেশের গানঝৌ শহর, যেখানে ভারী বিরল খনিজ উত্তোলন ব্যাপকভাবে চলছিল, সেখানে অম্লবৃষ্টির হার ৯০ শতাংশেরও বেশি রেকর্ড করা হয়।
এগুলো দেখায়, চীনের সস্তা খনিজ উৎপাদনের পেছনে কেবল কম শ্রমমূল্য নয়, পরিবেশগত একটি বিশাল মূল্যও ছিল।
কম দাম নিয়ে চীন নিজেই ছিল অসন্তুষ্ট
আজকের প্রচলিত ধারণা হলো, বিদেশি প্রতিযোগীদের বাজার থেকে সরাতে চীন ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে রেখেছিল।কিন্তু প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলছে, চীনা কর্মকর্তারা বরং কম দামকে সমস্যা হিসেবে দেখতেন।দেশটির ভেতরে অভিযোগ ছিল, মূল্যবান খনিজ এমন দামে বিক্রি হচ্ছে যেন সেগুলো সাধারণ সবজি বা মাটির মতো সস্তা।
অনেক চীনা নীতিনির্ধারক মনে করতেন, উন্নত দেশগুলো নিজেদের মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করে রেখে চীনের সস্তা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছে।
ফলে ২০০২ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।
ধীরে ধীরে কঠোর হলো নিয়ন্ত্রণ
২০০২ সালে অনুমোদনহীন খনি ও দূষণকারী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়।২০০৫ সালে বিরল খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রে কর ফেরত সুবিধা বাতিল করা হয়।২০০৬ সালে উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে কোটা চালু করা হয়।
এরপর ২০০৭ সালে বিরল খনিজ আকরিক, অক্সাইড ও যৌগের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করা হয়।
এরও আগে ১৯৯৯ সালে রপ্তানি কোটা চালু হয়েছিল।এই নীতিগুলোর ফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে চীনের ঘোষিত বিরল খনিজ রপ্তানি ২০০৫ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।
কিন্তু এখানেও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কার্যকর ছিল না।
সরকারের কোটার চেয়েও ৩৫ শতাংশ বেশি উৎপাদন
২০১০ সালেও চীনের প্রকৃত উৎপাদন সরকারি কোটার তুলনায় ৩৫ শতাংশেরও বেশি ছিল।
দক্ষিণ চীনের অবৈধ খনিগুলো একপর্যায়ে বিশ্বের ভারী বিরল খনিজ ব্যবহারের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করছিল।
অর্থাৎ বর্তমানে যাকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত চীনা শিল্প বলে মনে হয়, তখন সেটির বড় অংশই ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বোঝায় যে চীনের বর্তমান আধিপত্য শুরু থেকেই সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ফল ছিল না।
২০১০ সালের জাপান সংকট সব বদলে দেয়
বিরল খনিজকে ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২০১০ সালে।
চীন ও জাপানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ দিয়াওইউ বা সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি চীনা মাছ ধরার নৌযানের সঙ্গে জাপানি উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজের সংঘর্ষ হয়।
জাপান চীনা নৌযানের অধিনায়ককে আটক করে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।এতে চীনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। একই সময় খবর ছড়িয়ে পড়ে, চীন জাপানে বিরল খনিজ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
জাপানের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তি শিল্প দ্রুত চাপ অনুভব করতে শুরু করে।জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরে যৌথভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ করে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই রপ্তানি বন্ধের নির্দেশ আসলেই চীনের কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হয়তো স্থানীয় কর্মকর্তারাই থামিয়েছিলেন চালান
গবেষণায় উঠে এসেছে, রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়তো কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পিত নির্দেশ ছিল না।
নানজিংয়ের উত্তরের একটি বন্দর এলাকার ক্ষুব্ধ সামরিক কর্মী, বন্দর শ্রমিক ও স্থানীয় শুল্ক কর্মকর্তারা জাপানের আচরণকে নতুন ধরনের আগ্রাসন মনে করে নিজেরাই চালান আটকে দিয়েছিলেন—এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাপানি শুল্ক কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তোলার পরই বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুরোপুরি জানতে পারে।
চীন পুরো সময় আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কথা অস্বীকার করেছিল।কিন্তু কে প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত বড় বিষয় হয়ে থাকেনি।
কারণ ঘটনাটি চীনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয়—বিরল খনিজের সরবরাহে সামান্য বাধাও আন্তর্জাতিক বাজারে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি খনিজের দাম প্রায় ৬ গুণ বেড়ে যায়
জাপান সংকটের পর বাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল নাটকীয়।শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত নিওডিমিয়ামের দাম ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রায় ৬ গুণ বেড়ে যায়।
এই ঘটনা চীনের নীতিনির্ধারকদের সামনে বিরল খনিজের নতুন ধরনের ক্ষমতা তুলে ধরে।এরপর চীনা গণমাধ্যমে বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি বাড়তে থাকে।তবে তখনও চীনের অনেক কর্মকর্তা সতর্ক ছিলেন।
তাদের আশঙ্কা ছিল, সরবরাহকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে অন্যান্য দেশ বিকল্প উৎস তৈরিতে দ্রুত বিনিয়োগ করবে। দীর্ঘমেয়াদে এতে চীনের বাজার নিয়ন্ত্রণই দুর্বল হতে পারে।
২০১২ সালের পর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার
২০১২ সাল থেকে বেইজিং বিরল খনিজ শিল্পের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে শুরু করে।দেশীয় প্রয়োজন নিশ্চিত করতে কৌশলগত মজুতও তৈরি করা হয়।
২০১৪ সালে শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পুরো খাতকে পুনর্গঠন করে ৬টি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর অধীনে নিয়ে আসে।পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে এই কাঠামো আরও একীভূত হয়ে ২টি বড় জাতীয় প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত হয়।
২০১৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত মেনে চীন বিরল খনিজ রপ্তানি কোটা বাতিল করে।তবে এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
চীন তখন সরবরাহের উৎস শনাক্তকরণ, উৎপাদন পর্যবেক্ষণ এবং বিদেশে খনিজ প্রকল্পে বিনিয়োগের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেয়।
জাপান শিক্ষা নিয়েছিল
২০১০ সালের সংকটের পর সবচেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় জাপান।সে সময় জাপান তার প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ চীন থেকে আমদানি করত।বর্তমানে তা কমে প্রায় ৬০ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ একটি বড় সরবরাহ সংকট জাপানকে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে।এই উদাহরণ চীনের জন্যও শিক্ষণীয়।
কোনো দেশ যদি সরবরাহ বন্ধের হুমকি খুব বেশি ব্যবহার করে, ক্রেতারা শেষ পর্যন্ত বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে শুরু করে। তখন যে নির্ভরতা প্রথমে শক্তির উৎস ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
ছোট বাজার, কিন্তু বিশাল প্রভাব
বিরল খনিজের আর্থিক বাজার তেলের তুলনায় খুবই ছোট।২০১১ সালে বিরল খনিজের বৈশ্বিক বার্ষিক বাণিজ্যের মূল্য ছিল প্রায় ৪২০ কোটি ডলার।অথচ এটি তখন বিশ্বে এক দিনের গড় তেল বাণিজ্যের মূল্য থেকেও কম ছিল।
২০১৪ সালের মধ্যে বিরল খনিজের বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল্য আরও কমে ১২০ কোটি ডলারে নেমে যায়।এই কম বাজারমূল্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে নতুন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি।ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা থেকে যায়।
২০১৯ সালে আবার সামনে আসে বিরল খনিজ
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বড় মোড় আসে ২০১৯ সালে।তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং প্রতিষ্ঠানটিকে রপ্তানি কালোতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
ফলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র দেশগুলোকেও তাদের পঞ্চম প্রজন্মের যোগাযোগব্যবস্থা থেকে হুয়াওয়েকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়।চীনের কাছে এটি ছিল বড় সতর্কবার্তা।
তখন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিরল খনিজকে পাল্টা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আলোচনা শুরু হয়।তবু বেইজিং তাৎক্ষণিকভাবে সেই পদক্ষেপ নেয়নি।
কারণ একই সময়ে চীন নিজের একটি বড় দুর্বলতাও বুঝতে পেরেছিল—উন্নত অর্ধপরিবাহীর জন্য দেশটি বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
২০২০ থেকে প্রস্তুতি আরও দ্রুত
মে ২০২০ সালে চীন দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দ্বিমুখী অর্থনৈতিক প্রবাহের কৌশল গ্রহণ করে।প্রথম গুরুত্ব দেওয়া হয় অর্ধপরিবাহী শিল্পকে।
২০২০ সালের শেষ দিকে চীন একটি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে প্রয়োজন হলে বিদেশে নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি সীমিত করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
এরপর ডিসেম্বর ২০২১ সালে চীন বিরল খনিজ গোষ্ঠী গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিষদ সরাসরি বিরল খনিজ শিল্পের ওপর আরও শক্তিশালী নজরদারি প্রতিষ্ঠা করে।
২০২২ সালের পর পাল্টাপাল্টি চাপ তীব্র হয়
যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনের উন্নত অর্ধপরিবাহী ও সেগুলো তৈরির সরঞ্জামে প্রবেশ সীমিত করার জন্য অক্টোবর ২০২২ সালে নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ চালু করে, তখন পরিস্থিতি আরও বদলে যায়।
জুন ২০২৩ সালের শেষ দিকে উন্নত অর্ধপরিবাহীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারণের আলোচনা শুরু হলে চীন জুলাই ২০২৩ সালে গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম রপ্তানিতে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম চালু করে।
এই দুটি খনিজ অর্ধপরিবাহী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন পুরোপুরি রপ্তানি বন্ধ করেনি, কিন্তু রপ্তানিকারকদের অনুমতির জন্য আবেদন এবং পণ্য কোথায় ব্যবহার হবে, সেই তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, চীন যদি এই দুই খনিজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার কমে যেতে পারে।
২১ ডিসেম্বর ২০২৩ আরেক বড় পদক্ষেপ
এর মাত্র ৬ মাস পর, ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে, চীন বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।কারণ শুধু খনিজের মজুত থাকলেই বিরল খনিজ শিল্প গড়ে তোলা যায় না। প্রয়োজন জটিল প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
সেই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে চীন বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির পথও কঠিন করে দেয়।
এর ১ বছর পর চীন প্রথমবার এমন নিয়ম জারি করে, যেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
২ এপ্রিল ২০২৫ থেকে সংঘাত নতুন পর্যায়ে
চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয় ২ এপ্রিল ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক ঘোষণার পর।
এর ২ দিন পর চীন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ৭টি বিরল খনিজ এবং সেগুলো দিয়ে তৈরি স্থায়ী চুম্বককে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।এসব পণ্য সামরিক ও বেসামরিক—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়।
কিন্তু চীনের নিজের প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এত বড় চাপের জন্য প্রস্তুত ছিল না।হাজার হাজার রপ্তানি অনুমতির আবেদন জমা পড়লেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্মী ছিলেন মাত্র ৩০ জন।ফলে আবেদন অনুমোদনে বড় ধরনের জট তৈরি হয়।
মে মাসে রপ্তানি কমে ৭৪ শতাংশ
অনুমোদনের জটের কারণে চীনের বিরল খনিজ চুম্বক রপ্তানি মে মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৪ শতাংশ কমে যায়।
এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বিমান ইঞ্জিন এবং অর্ধপরিবাহী নকশা তৈরির প্রযুক্তির ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে।পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে দুই দেশকেই শেষ পর্যন্ত কিছুটা পিছু হটতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ওই পদক্ষেপগুলোর কিছু প্রত্যাহার করে এবং জুনে নতুন আলোচনায় রাজি হয়, তখন চীনও বিরল খনিজ ও চুম্বক রপ্তানি আবার চালু করতে সম্মত হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর নতুন চাপ
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকা চীনা প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কালোতালিকাভুক্ত কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অন্য প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি হলে সেই প্রতিষ্ঠানও বিধিনিষেধের আওতায় আসবে।মাত্র ১০ দিন পর চীন পাল্টা আরও কঠোর ব্যবস্থা ঘোষণা করে।
প্রথমবারের মতো চীন দাবি করে, বিশ্বের যেকোনো দেশে তৈরি এমন পণ্যের ওপরও তারা রপ্তানি অনুমতির নিয়ম প্রয়োগ করতে পারবে, যদি সেখানে নিয়ন্ত্রিত চীনা বিরল খনিজের সামান্য অংশও থাকে অথবা চীনা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
এর আওতায় প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, অর্ধপরিবাহী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রসহ বহু শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, চীন যদি এসব বিধিনিষেধ পুরোপুরি কার্যকর করত, তাহলে চীনের বাইরের শিল্পখাতে প্রায় ৬ দশমিক ৫ লাখ কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারত।
শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই পিছু হটে
অর্থনৈতিক সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দুই দেশই বুঝতে পারে, পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ক্ষতি শুধু প্রতিপক্ষের হবে না।
বুসানে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনে চীন তার সীমান্তের বাইরেও কার্যকর হওয়ার কথা বলা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ১ বছরের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত নিয়ম ১ বছরের জন্য স্থগিত করে।
এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক অস্ত্র যত শক্তিশালীই মনে হোক না কেন, তা ব্যবহার করলে নিজের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চীনকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কি সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্র এখন বিরল খনিজের জন্য বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করছে।এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সব বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ করা বাস্তবসম্মত নয়।
কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার প্রয়োজনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিরল খনিজও চীনের বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে পারে, তাহলেও বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ইট্রিয়াম সবচেয়ে কঠিন সমস্যা
সব বিরল খনিজের বিকল্প তৈরি সমান সহজ নয়।ইট্রিয়াম এমন একটি খনিজ, যা অর্ধপরিবাহী, বিমান ইঞ্জিন এবং টারবাইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এটির বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরিতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
এ কারণেই কিছু বিশ্লেষক এটিকে সরবরাহব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বল জায়গাগুলোর একটি হিসেবে দেখেন।তবে চীনেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
বিরল খনিজ পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।অর্থাৎ চীন শক্তিশালী হলেও পুরো শিল্পব্যবস্থা এককভাবে তার নিয়ন্ত্রণে নয়।
অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে শক্তি কমেও যেতে পারে
বিরল খনিজের ক্ষেত্রে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে।চীন যতক্ষণ নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী, ততক্ষণ বিশ্বের বড় অংশ তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে।
কিন্তু যদি বারবার রাজনৈতিক কারণে সরবরাহ বন্ধ করা হয়, অন্য দেশগুলো বিকল্প তৈরিতে বাধ্য হবে।২০১০ সালের পর জাপানের অভিজ্ঞতা এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
সে সময় চীনের ওপর জাপানের নির্ভরতা ছিল ৯০ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ৬০ শতাংশ।অর্থাৎ সরবরাহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ভয়ই দীর্ঘমেয়াদে সেই অস্ত্রের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
একই সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রেরও আছে
এই বাস্তবতা শুধু চীনের ক্ষেত্রে নয়।
বিশ্বের ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ওয়াশিংটন সেই প্রভাব ব্যবহার করে অন্য দেশকে চাপ দিতে পারে।
কিন্তু চীনের মতো বিশাল অর্থনীতিকে পুরোপুরি বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও বড় ক্ষতি হবে।
একইভাবে ওষুধের কাঁচামালের বড় অংশে চীনের প্রভাব থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করলে চীনের নিজস্ব জীবপ্রযুক্তি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কারণ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মার্কিন প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
পুরো বিচ্ছিন্নতার মূল্য ১৩ লাখ কোটি ডলার
চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও উৎপাদন সরবরাহব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার অর্থনৈতিক মূল্যও বিশাল।একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়ন করতে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ১৩ লাখ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।
এটি দেখায়, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা শুধু রাজনৈতিকভাবে কঠিন নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আসল লড়াই খনিজ নয়, নির্ভরতার ওপর নিয়ন্ত্রণ
বিরল খনিজকে ঘিরে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।চীন ও যুক্তরাষ্ট্র আসলে শুধু কয়েকটি খনিজ নিয়ে লড়ছে না।
তারা চেষ্টা করছে এমন সব জায়গায় নিজেদের দুর্বলতা কমাতে, যেখানে প্রতিপক্ষ ভবিষ্যতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।চীন উন্নত অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তিতে বিদেশি নির্ভরতা কমাতে চাইছে।অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজ, চুম্বক এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
এক পক্ষ যত বেশি নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্য পক্ষ সেটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে।ফলে তৈরি হচ্ছে পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা নেওয়ার একটি চক্র।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই
চীনের বিরল খনিজ আধিপত্যের ইতিহাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, আবার শুরু থেকেই বিশ্বকে জিম্মি করার পরিকল্পনাও ছিল না।
শুরুতে মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি থেকে আয় করা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।পরে অতিরিক্ত উৎপাদন, কম দাম, পরিবেশের ক্ষতি ও সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে সরকার নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।
এরপর ২০১০ সালের জাপান সংকট চীনকে দেখায়, এই শিল্প ভূরাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করতে পারে।
আর যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক চাপ চীনকে ধীরে ধীরে সেই সম্ভাবনাকে আরও সংগঠিতভাবে ব্যবহারের দিকে ঠেলে দেয়।
অর্থাৎ আজকের বিরল খনিজ সংঘাত একতরফা কোনো পরিকল্পনার ফল নয়। এটি বহু বছরের পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্তের ফল।
সামনে কোন পথ
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিকল্প খনি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।কিন্তু সব সম্পর্ক ছিন্ন করাই সমাধান নয়।
একইভাবে চীনের জন্যও বিরল খনিজকে বারবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা লাভজনক নাও হতে পারে। কারণ এতে অন্য দেশ আরও দ্রুত বিকল্প তৈরি করবে।
দুই দেশের অর্থনীতি এত গভীরভাবে যুক্ত যে একজন আরেকজনকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ কারণেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ না করে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া।
একাধিক দেশ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা, নতুন খনি তৈরি, পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চালু রাখা—এই ভারসাম্যই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।
চীনের বিরল খনিজ শক্তির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক নির্ভরতা একই সঙ্গে শক্তি এবং দুর্বলতা—দুটিই হতে পারে।চীন বর্তমানে বিশ্বের বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবস্থান তাকে বিপুল প্রভাব দিয়েছে।কিন্তু সেই প্রভাব সীমাহীন নয়।
চীন যদি সরবরাহকে খুব বেশি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, বিশ্ব বিকল্প তৈরি করবে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনকে সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে, তার নিজের অর্থনীতিও বিশাল মূল্য দেবে।
ফলে বিরল খনিজের ভবিষ্যৎ শুধু কে কত খনি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
আসল প্রশ্ন হলো—চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াতে গিয়ে এমন একটি প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়বে কি না, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষের দুর্বল জায়গা চেপে ধরার জন্য ক্রমাগত নতুন অস্ত্র তৈরি করবে।
যদি সেই প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, ক্ষতি শুধু বেইজিং বা ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি, গাড়ি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, উৎপাদন ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।
আর যদি দুই দেশ বুঝতে পারে যে পারস্পরিক নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ করার চেয়ে সেটিকে নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় করা বেশি বাস্তবসম্মত, তাহলে বিরল খনিজ ভবিষ্যতের বড় সংঘাতের অস্ত্র না হয়ে বরং সহযোগিতা ও পারস্পরিক সংযমের কারণও হয়ে উঠতে পারে।

