যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করে দিতে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরির পথে এগোচ্ছে, তখন তেহরানও পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে জানিয়েছে—ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের মূল্য শুধু ইরানকে নয়, পুরো অঞ্চল ও বিশ্বকেও দিতে হতে পারে।
সোমবার মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। এর লক্ষ্য, কয়েক বছর ধরে ইরান যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তার মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নতুন ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি এবং জাহাজ চলাচলের মতো খাতও রয়েছে।
তবে বহুল আলোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণার পর অনেকের প্রত্যাশার তুলনায় পদক্ষেপটি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। ওয়াশিংটন আপাতত বড় কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বদলে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ ও কার্যকর করার দিকে জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই চাপের কাছে নতি স্বীকারের বদলে ইরান উল্টো নিজেদের হাতে থাকা পাল্টা চাপের কৌশল সামনে আনছে। তেহরানের হুমকির মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বাড়ানো, ইউরোপের দেশগুলোকে সংঘাতের আওতায় আনা এবং এমনকি পারমাণবিক কর্মসূচির নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবা খেলছি। আমরা পোকার খেলতেও শিখেছি। এখন কিছু সময় ধরে দুটির সমন্বয়েই খেলছি।’
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের জবাবে ইরান কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম আরও বাড়ানোর চেষ্টা
ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী পাল্টা হাতিয়ার হতে পারে তেল সরবরাহ।
যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে আসছে ইরান। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। এখন তেহরান হরমুজের বাইরেও জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল পরিবহনের বিকল্প রুটগুলোকে লক্ষ্য করার হুমকি দিচ্ছে।
ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি গোষ্ঠীও সম্প্রতি লোহিত সাগরে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তারা সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নেতা মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি তো নয়ই, পারস্য উপসাগরের কোনো পথ দিয়েই এক ফোঁটা তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
পরবর্তী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হবে ‘ভূমিকম্পের মতো’।
এ ধরনের হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। আর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ইরানের নজর এড়াতে নিজেদের তেলবাহী জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে বিকল্প উপায়ে তেল রপ্তানির চেষ্টা করছে। কিছুটা সফল হলেও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক কম।
সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথে আরও প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে।
কিন্তু এসব জাহাজও এখন ইরানের নজরে রয়েছে।
হরমুজে নিজেদের আরোপ করা নিয়ম মানছে না—এমন ৪৫টি জাহাজের তালিকা প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরান সতর্ক করেছে, এসব নিয়ম অমান্যকারী জাহাজ ভবিষ্যতে হরমুজ দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে জরিমানা, আটক কিংবা জাহাজ জব্দের মতো পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে।
যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি বাড়াতে পারে তেহরান
ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুলগেরিয়ার ভূখণ্ড থেকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান উড্ডয়নের বিষয়টি সামনে আনে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়, প্রয়োজনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ও ন্যাটোভুক্ত এই দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনের উৎস বা যেখান থেকে হামলা পরিচালিত হচ্ছে, সেটিকে লক্ষ্য করার ‘বৈধ অধিকার’ ইরানের রয়েছে।
তার দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনকে কোনো দেশ সমর্থন করলে তেহরান আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সেটিকে আগ্রাসনে অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করবে।
যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান মোট ১১টি দেশে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বেশিরভাগই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ। তবে ব্রিটিশ বাহিনী ব্যবহৃত সাইপ্রাসের একটি ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরের গভীরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত দ্বীপগুলোতেও আঘাত হানার সক্ষমতা ইরান দেখিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বুলগেরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এবং ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে ইরানের হামলা হলে তা চলমান সংঘাতকে অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
মোহসেন রেজাইও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে ইরান ‘যুদ্ধের কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করবে।
পারমাণবিক নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ইরানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পাল্টা পদক্ষেপ হতে পারে পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে।
তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক ও সরকারি মহলের একাংশে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক পুরোনো নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
খামেনি নিজে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ইরানের কিছু প্রভাবশালী মহলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আলোচনা জোরালো হয়েছে।
ইরানের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যে এনপিটি থেকে সরে আসার বিষয়ে একটি বিল নিয়ে আলোচনা করছেন।
রোববার মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক বিরল বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার কথাও প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘পুরো বিশ্ব যখন বলছে, তাহলে এনপিটির কোনো প্রভাব আছে কি?’ এরপর বলেন, আমেরিকা যখন এ ধরনের যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন মানুষ প্রশ্ন করতেই পারে—‘আমরা নিজেরাই কেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করব না?’
এদিকে ইরানের ভেতরে বিপুল পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিমাণ প্রায় আধা টন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন, ইরান ওই মজুত আরও সুরক্ষিতভাবে লুকিয়ে বা সিল করে রাখার চেষ্টা জোরদার করেছে।
নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ও পাল্টা প্রতিরোধ
বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক পদক্ষেপ একসঙ্গে চালিয়ে গেলেও ইরানকে তার মূল আলোচনার অবস্থান থেকে সরানো সহজ হবে না। তেহরানের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি।
ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অবরোধ যত বেশি বিস্তৃত হবে, তা কার্যকর করতে তত বেশি দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। আর সেই সহযোগী দেশগুলোকেই পাল্টা চাপ দেওয়ার সুযোগ পাবে ইরান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তৌসি বলেন, ইরান তার ওপর চাপানো অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি বড় অংশ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলে সেই ক্ষতি অন্য দেশগুলোর ওপরও চাপিয়ে দিতে পারে তেহরান।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অবরোধ গড়ে তুলবে, তত বেশি দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। আর এর ফলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্য ইরানের সামনে আরও বেশি লক্ষ্য তৈরি হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সম্ভাব্য কৌশল তাই দুটি ধারায় এগোতে পারে—একদিকে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বিকল্প অর্থনৈতিক পথ ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে ইরানকে পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করলে এর মূল্য শুধু তেহরানকে দিতে হবে না, পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব অর্থনীতিকেও তার অংশ বহন করতে হবে।
অর্থাৎ, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’র জবাবে ইরানের লড়াই শুধু অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। জ্বালানি সরবরাহে চাপ, আঞ্চলিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি, ইউরোপকে সংঘাতের আওতায় আনার সম্ভাবনা এবং পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তনের আলোচনা—সব মিলিয়ে তেহরান এমন একটি কৌশল নিতে পারে, যার লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো যে ইরানের অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করার চেষ্টা করলে তার প্রতিক্রিয়াও হবে বহুমাত্রিক এবং ব্যয়বহুল।

